বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে একাদশ নির্বাচন, টসের সিদ্ধান্ত কিংবা উইকেটের আচরণ। কোন কম্বিনেশন সবচেয়ে কার্যকর হবে, ব্যাটিং না বোলিং—এসব নিয়েই থাকার কথা ছিল মূল আলোচনা। সবকিছু ঠিক থাকলে এবার কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মাঠে নামত বাংলাদেশ। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ কেবলই একজন দর্শক।
ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি মিলিয়ে বৈশ্বিক কোনো আসরে বাংলাদেশ সর্বশেষ অনুপস্থিত ছিল ১৯৯৬ সালে। সেটিও হয়েছিল উপমহাদেশেই। তখন বিশ্বকাপ মানেই ছিল রূপকথার মঞ্চ—যেখানে বাংলাদেশের উপস্থিতি কেবল কল্পনাতেই সম্ভব ছিল। টিভির পর্দায় অন্য দলগুলোকে খেলতে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন দেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা। প্রায় তিন দশক পর সেই পুরোনো অনুভূতিই আবার ফিরে এলো।
বাংলাদেশ যে এবারের বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেছে, তার কারণ ও প্রেক্ষাপট নতুন করে বলার কিছু নেই। তবু বিশ্বকাপ শুরুর দিনে এই বিষাদবোধ অনিবার্যই বটে।
শনিবার ভারত ও শ্রীলঙ্কায় শুরু হচ্ছে দশম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। উদ্বোধনী দিনেই তিনটি ম্যাচে জমে উঠবে টুর্নামেন্ট। কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব মাঠে বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ১১টায় মুখোমুখি হবে পাকিস্তান ও নেদারল্যান্ডস। দিনের দ্বিতীয় ম্যাচটি হওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশের। তবে সেই ম্যাচে এখন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে খেলবে স্কটল্যান্ড। বাংলাদেশ সময় বিকেল সাড়ে ৩টায় শুরু হবে ম্যাচটি।
দিনের শেষ ম্যাচে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় মুম্বাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি হবে স্বাগতিক ভারত।
গত আসরের চ্যাম্পিয়ন ভারত এবারের বিশ্বকাপেও পরিষ্কার ফেভারিট হিসেবে যাত্রা শুরু করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে তাদের পারফরম্যান্স চোখে পড়ার মতো। অনিশ্চয়তার এই ফরম্যাটেও তারা বিস্ময়কর ধারাবাহিকতা দেখিয়েছে। ২০২৩ সালের আগস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে সিরিজ হারের পর আর পেছনে তাকাতে হয়নি সুরিয়াকুমার যাদবের দলকে। এরপর সিরিজ ও টুর্নামেন্ট মিলিয়ে টানা ১৫ আসরে তারা অপরাজিত থেকেছে। এর মধ্যে ১১টি দ্বিপাক্ষিক সিরিজ জয়, একটি ড্র, সঙ্গে ২০২৩ এশিয়ান গেমসের সোনা, ২০২৪ বিশ্বকাপ ও ২০২৫ এশিয়া কাপের শিরোপা—সব মিলিয়ে দুর্দান্ত সময় কাটাচ্ছে ভারত।
গত বিশ্বকাপের ফাইনালে হৃদয়ভাঙা দক্ষিণ আফ্রিকাকেও এবার ফেভারিটদের তালিকায় রাখতে হচ্ছে। ব্যাটিং ও বোলিং—দুই বিভাগেই তারা যথেষ্ট শক্তিশালী। বড় মঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করার ক্ষুধা তাদের অন্যতম শক্তি।
অস্ট্রেলিয়ার গল্পটা কিছুটা ভিন্ন। বিশ্বকাপের আগে পর্যন্ত টি-টোয়েন্টিতে টানা ছয়টি সিরিজে অপরাজিত ছিল তারা। তবে সবশেষ দুই সিরিজে ভারত ও পাকিস্তানের কাছে হেরে আত্মবিশ্বাসে ধাক্কা খেয়েছে দলটি। তার ওপর প্যাট কামিন্স ও জশ হেইজেলউডের চোট সমস্যা দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে। টিম ডেভিড ও ন্যাথান এলিস ফিরছেন চোট কাটিয়ে। সব মিলিয়ে নড়বড়ে প্রস্তুতি নিয়েই নামছে অজিরা। তবু বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়াকে কখনোই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
ইংল্যান্ড আছে রূপান্তরের মধ্যে। দল গঠনে পরিবর্তন এলেও যে কোনো মুহূর্তে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা তাদের রয়েছে। ট্রফির দাবিদার হিসেবেই বিবেচিত হবে তারা।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে বিতর্কে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় পাকিস্তান। বাংলাদেশের সমর্থনে আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে দেশটির সরকার। বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চলছে তোলপাড়। পাকিস্তানকে মাঠে নামাতে নানা কূটনৈতিক চেষ্টা চলছে বলেও জানা গেছে। সেমিফাইনাল বা ফাইনালে ভারতের মুখোমুখি হলে কী অবস্থান নেবে তারা, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কিছু জানানো হয়নি। নাটকীয়তা যে তাদের ক্রিকেটের অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেটি নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।
একইভাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজকেও অবহেলা করার সুযোগ নেই। তাদের দুটি টি-টোয়েন্টি শিরোপার একটি শ্রীলঙ্কায়, অন্যটি ভারতে—এবারও এই দুই দেশেই হচ্ছে বিশ্বকাপ। ইতিহাস অন্তত তাদের পক্ষেই কথা বলে।
শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে চিত্রটা উল্টো। তারা বড় কিছু করে ফেললে সেটিই হবে চমক। অন্যদিকে নিউ জিল্যান্ড গত দেড় দশকে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সে নিজেদের আলাদা অবস্থান তৈরি করেছে। পেশাদারিত্ব আর ঠাণ্ডা মাথার ক্রিকেটে তারাও দূর পর্যন্ত যেতে পারে।
এই আসরে বাড়তি কৌতূহল থাকবে ইতালিকে ঘিরে। ফুটবলের পরাশক্তি দেশটি প্রথমবার ক্রিকেট বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে। বড় চমক না দিলেও তাদের উপস্থিতিই কৌতূহলের জন্ম দিচ্ছে।
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে। কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে বাস্তবতা। এবারের বিশ্বকাপেও থাকবে চার-ছক্কার বন্যা, দুর্দান্ত ডেলিভারি, চোখধাঁধানো ক্যাচ আর শেষ ওভারের রোমাঞ্চ। তবে এসবের মাঝেই বাংলাদেশের অসংখ্য ক্রিকেটপ্রেমীর হৃদয়ে বয়ে যাবে এক ধরনের নীরব বেদনার স্রোত—কারণ মাঠে নেই প্রিয় দল।

