আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশব্যাপী একযোগে ‘সারপ্রাইজ’ অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ইতোমধ্যে সারাদেশে বাহিনী মোতায়েনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং যে কোনো দিন, যে কোনো সময় এই বিশেষ অভিযান শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
আগামী রবিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন শুরু হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে মঙ্গলবারের মধ্যে এই মোতায়েন জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও বিস্তৃত হবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, এই অভিযানের জন্য কোনো নির্দিষ্ট দিন বা সময় নির্ধারণ করা হয়নি। হঠাৎ করেই একযোগে অভিযান শুরু হবে। অভিযানে চিহ্নিত সন্ত্রাসী, খুনি, অস্ত্রধারী, মাদক ব্যবসায়ীসহ যেকোনো ধরনের অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হবে। তার ভাষায়, “এই অভিযানের ফলে কেউ নির্বাচনের সময় সন্ত্রাস বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সাহস পাবে না।”
এরই মধ্যে শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) ফরিদপুরে একটি বড় ধরনের অস্ত্র উদ্ধার অভিযান পরিচালিত হয়েছে। দুপুরে সদর উপজেলার কানাইপুর আখ সেন্টার সংলগ্ন একটি পুকুর থেকে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি ও ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করে সেনাবাহিনী।
সকাল থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে বিকেল ৪টার দিকে অস্ত্রগুলো উদ্ধার করা হয়। অভিযানে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি পুলিশ, বিজিবি ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরাও অংশ নেন।
ফরিদপুর সেনা ক্যাম্পের কমান্ডার মেজর সোহেল আহমেদ জানান, সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে পুকুরে অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুকিয়ে রাখা হয়েছে—এমন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। প্রথমে সেচযন্ত্রের মাধ্যমে পুকুরের পানি সরানো হয়। এরপর ফায়ার সার্ভিসের কর্মী ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় মাছ ধরার জাল ব্যবহার করে অস্ত্রগুলো উদ্ধার করা হয়।
তিনি আরও জানান, উদ্ধার হওয়া অস্ত্রগুলোর সঙ্গে থানা থেকে লুট হওয়া পুলিশের ব্যবহৃত কোনো অস্ত্রের মিল পাওয়া যায়নি। নির্বাচনকে সামনে রেখে নাশকতার উদ্দেশ্যেই এগুলো মজুত করা হয়েছিল বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
উদ্ধারকৃত অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে—৪টি বিদেশি পিস্তল, ২টি সিঙ্গেল ব্যারেল পাইপ গান, ১৬ রাউন্ড পিস্তলের গুলি, ২টি কার্তুজ, বিভিন্ন আকারের প্রায় ১০০টি দেশীয় ধারালো অস্ত্র, ৮টি চাইনিজ কুড়াল ও শরকি।
পুলিশ সদর দপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নির্বাচনকে ঘিরে যেকোনো ধরনের সহিংসতা, নাশকতা বা আইনবিরোধী কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে দমন করার নির্দেশনা দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সেই অনুযায়ী সব বাহিনী সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করবে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, গত বছরের ১৯ জুলাই থেকে সেনাবাহিনী সারাদেশে মোতায়েন রয়েছে। অস্ত্র উদ্ধার, তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার এবং সহিংসতা প্রতিরোধে তারা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। ভোটকেন্দ্র দখল, কেন্দ্রভিত্তিক সহিংসতা কিংবা অন্য যেকোনো বেআইনি কার্যক্রম কঠোরভাবে দমন করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
নির্বাচনকালীন সময়ে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, কোস্ট গার্ড ও আনসার বাহিনী একযোগে দায়িত্ব পালন করবে।
ইতোমধ্যে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ২০২৬ উপলক্ষে রাজধানীসহ বিভিন্ন সেনা ক্যাম্প ও পদাতিক ডিভিশন পরিদর্শন করেছেন। তিনি ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা, বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসন এবং বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে আন্তঃপ্রতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
এদিকে নৌবাহিনীর প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান উপকূলীয় এলাকা পরিদর্শন করে নির্বাচনে নিয়োজিত নৌ কন্টিনজেন্টের প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেছেন।
সব মিলিয়ে দেশজুড়ে কঠোর ও সমন্বিত নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। এই প্রস্তুতি ভোটের দিন কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে—সেদিকেই এখন তাকিয়ে দেশবাসী।

