বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে এইচআইভি সংক্রমণের দিক থেকে একটি স্বস্তিকর অবস্থানে ছিল। সাধারণ জনসংখ্যায় সংক্রমণের হার কম থাকায় একে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণযোগ্য জনস্বাস্থ্য ইস্যু হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোর চিত্র সেই আত্মতুষ্টির জায়গায় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। নতুন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, আর সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো- এই সংক্রমণ ক্রমেই তরুণ ও যুব সমাজের মধ্যে বিস্তৃত হচ্ছে। বিষয়টি আর অবহেলার সুযোগ রাখে না।
২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশে নতুন করে ১ হাজার ৮৯১ জন এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই পরিসংখ্যানের ভেতরে লুকিয়ে আছে আরও গভীর এক বাস্তবতা। নতুন সংক্রমণের একটি বড় অংশ ঘটছে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে। অর্থাৎ যাদের হাতে দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, শ্রমশক্তি ও সৃজনশীলতা থাকার কথা, তারাই ধীরে ধীরে একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগের ঝুঁকিতে পড়ছে।
এইচআইভি সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় যে কারণটি চোখে পড়ে, তা হলো যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে গভীর অজ্ঞতা ও নীরবতা। আমাদের সমাজে যৌনতা নিয়ে কথা বলা এখনও লজ্জা ও সংকোচের বিষয়। পরিবারে নয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও নয়- ফলে তরুণরা তথ্য নেয় বন্ধুদের কাছ থেকে, সামাজিক মাধ্যম থেকে কিংবা ভুল উৎস থেকে। নিরাপদ যৌন আচরণ, কনডমের সঠিক ব্যবহার কিংবা যৌনবাহিত রোগ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ধারণার অভাব তাদের অরক্ষিত সম্পর্কের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
অনেক তরুণ বিশ্বাস করে, পরিচিত বা ‘বিশ্বস্ত’ সঙ্গীর সঙ্গে কনডমের প্রয়োজন নেই। এই বিশ্বাস যে কতটা বিপজ্জনক, তা তারা বোঝে না। সম্পর্কের স্থায়িত্ব সংক্রমণের ঝুঁকি নির্ধারণ করে না- এই মৌলিক সত্যটি না জানার ফলেই এইচআইভির মতো ভাইরাস নীরবে ছড়িয়ে পড়ছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তরুণদের সামাজিক আচরণেও পরিবর্তন এসেছে। একাধিক সঙ্গী, সম্পর্কের শুরুতেই শারীরিক ঘনিষ্ঠতা কিংবা কনডম ছাড়া যৌন সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রেই ঝুঁকির বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক চাপ। অনেক সময় কনডম ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া মানেই অবিশ্বাস বা সন্দেহের জন্ম দেওয়া- এমন ধারণা কাজ করে। বিশেষ করে তরুণীরা এই বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে বেশি সংকোচ বোধ করে, যা তাদের ঝুঁকির মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়। এইচআইভি সংক্রমণের আরেকটি ভয়াবহ কিন্তু তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত দিক হলো ইনজেকশন দিয়ে মাদক গ্রহণ। একই সুই বা সিরিঞ্জ একাধিকজনের মধ্যে ব্যবহার হলে এইচআইভি খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তরুণদের একটি অংশ কৌতূহল, মানসিক চাপ, হতাশা কিংবা বন্ধুবান্ধবের প্রভাবে মাদকের দিকে ঝুঁকছে। পর্যাপ্ত পুনর্বাসন, ক্ষতি-হ্রাসমূলক কর্মসূচি ও মানসিক সহায়তার অভাবে এই ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো পরীক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশের মানসিক বাধা। এইচআইভি পরীক্ষা করানো এখন প্রযুক্তিগতভাবে সহজ হলেও সামাজিকভাবে এখনও কঠিন। কলঙ্ক, গোপনীয়তা ভঙ্গ হওয়ার ভয় এবং বিচার হওয়ার আশঙ্কা তরুণদের পরীক্ষা থেকে দূরে রাখছে। অনেকেই মনে করে, পরীক্ষা করালেই সমাজে পরিচয় ফাঁস হয়ে যাবে। ফলে তারা উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করে, আর তখন রোগ অনেকটাই জটিল পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
এ বাস্তবতায় মনে রাখা জরুরি, এইচআইভি এখন আর মৃত্যু নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি কিন্তু নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগ। সময়মতো পরীক্ষা ও অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি শুরু করলে একজন আক্রান্ত ব্যক্তি দীর্ঘদিন সুস্থ জীবনযাপন করতে পারেন। এমনকি নিয়মিত চিকিৎসা নিলে ভাইরাসের মাত্রা এতটাই কমে আসে যে অন্যের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকিও কার্যত থাকে না। কিন্তু এই সুফল পেতে হলে প্রথম শর্ত হলো- ভয় নয়, সচেতনতা। সমাধানের পথ তাই কেবল চিকিৎসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষা, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র-সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুল পর্যায়ে বিজ্ঞানভিত্তিক যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। সঠিক তথ্য তরুণদের কাছে সহজ ভাষায় পৌঁছে দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণ বৃদ্ধি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি দীর্ঘদিনের নীরবতা, অজ্ঞতা ও সামাজিক দ্বিধার ফল। তবে এখনও সময় আছে। সঠিক সিদ্ধান্ত, সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই সংক্রমণের গতি থামানো সম্ভব।
ডা. আয়শা আক্তার : উপপরিচালক, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টিবি হাসপাতাল, শ্যামলী, ঢাকা
মতামত লেখকের নিজস্ব

