দেশের জ্বালানি তেলের বাজারে বিরাজমান অস্থিরতা ও সম্ভাব্য মজুত সংকট কাটাতে বড় ধরনের স্বস্তির খবর দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। চলতি এপ্রিল মাসেই ডিজেল ও অপরিশোধিত তেলের একাধিক বড় চালান দেশে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে, যা সামগ্রিক সরবরাহ পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় যে সাময়িক টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছিল, তা মোকাবিলায় সরকার নতুন উৎস থেকে তেল আমদানি এবং জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছে। এর ফলে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্যমতে, ৩ এপ্রিল ৬০ হাজার টন ডিজেল বহনকারী দুটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। পাশাপাশি পুরো এপ্রিল মাসজুড়ে ধাপে ধাপে আরও কয়েক লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানির সময়সূচি নির্ধারিত হয়েছে। বর্তমানে বিদ্যমান মজুতের সঙ্গে নতুন আমদানি যুক্ত হলে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ডিজেলের চাহিদা পূরণে ইতোমধ্যে সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়ার একাধিক কোম্পানি থেকে বড় অংকের তেল আমদানির নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে।
অকটেন ও পেট্রোলের মজুত নিয়েও তাৎক্ষণিক কোনো সংকট নেই বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। বেসরকারি শোধনাগার এবং আমদানিকৃত অকটেনের মাধ্যমে চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে। প্রয়োজনে অকটেনকে পেট্রোলে রূপান্তরের পরিকল্পনাও রাখা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধজনিত প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সরকারের কূটনৈতিক উদ্যোগ সফল হয়েছে। বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী ছয়টি জাহাজকে প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, ফলে এলএনজি ও জ্বালানি তেলবাহী জাহাজগুলোর দেশে পৌঁছানো সহজ হয়েছে।
এদিকে এমটি নরডিক পলুকস জাহাজে আটকে থাকা এক লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেল ছাড়িয়ে আনার প্রচেষ্টা চলছে। বিকল্প হিসেবে সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলীয় বন্দর থেকে আরও এক লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেল কেনা হয়েছে, যা আগামী মাসের শুরুতে দেশে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড বর্তমানে নিজস্ব মজুত দিয়ে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। নতুন অপরিশোধিত তেল আসলে বিপুল পরিমাণ ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও ফার্নেস অয়েল উৎপাদন সম্ভব হবে। সরকার এখন জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং নাইজেরিয়া, কাজাখস্তান, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ থেকে তেল সংগ্রহের উদ্যোগ নিচ্ছে।
এছাড়া রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে, কারণ মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আংশিক শিথিল হওয়ায় এ সুযোগ তৈরি হয়েছে। সরকারের সমন্বিত উদ্যোগের ফলে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের আশঙ্কা কমছে এবং তিন মাসের অগ্রিম মজুত গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে রয়েছে।
জানা গেছে, জুন পর্যন্ত জ্বালানি তেলের চাহিদা মেটাতে আগাম ক্রয় সম্পন্ন করা হয়েছে। যদিও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে গত মাসে কিছু জাহাজ সময়মতো আসতে না পারায় সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছিল এবং প্রায় দেড় লাখ টন ডিজেলের ঘাটতি দেখা দেয়।
ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিপরিষদ কমিটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ ডিজেল ও অপরিশোধিত তেল কেনার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনায় সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে এসব তেল সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের তাগাদা দেওয়া হয়েছে।
এপ্রিলে অকটেনের চাহিদা ৩৭ হাজার টন, যার মধ্যে স্থানীয় শোধনাগার থেকে ৩০ হাজার টন সরবরাহের কথা রয়েছে এবং আমদানি করা হবে আরও ৫০ হাজার টন। পেট্রোলের চাহিদা ৪৪ হাজার টনের বিপরীতে স্থানীয়ভাবে ৩৫ হাজার টন পাওয়া যাবে, বাকি ঘাটতি অকটেন রূপান্তরের মাধ্যমে পূরণ করা হবে।
উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট চলমান থাকলেও গত মার্চ মাসে এলপিজি, এলএনজি, ক্রুড অয়েল ও ডিজেলসহ অন্তত ৩৯টি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে, যার বেশিরভাগ জ্বালানি বিকল্প দেশ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।

