খুলনা মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রধান অবলম্বন খালগুলো দখল, ভরাট ও দূষণের কারণে কার্যত মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার ও খননের দাবি করা হলেও অধিকাংশ খালে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আসন্ন বর্ষায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতার আশঙ্কা করছেন নগরবাসী।
বুধবার (১০ জুন) সরেজমিনে নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, এক সময়ের গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুহারা খাল এখন বর্জ্য ও কচুরিপানায় ভরাট হয়ে গেছে। ড্রেন ও বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের প্রধান এই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।
বাস্তুহারা খালের পাশাপাশি তালতলা, রায়ের মহল-মোল্লাপাড়া বাটকেরি, নিরালা ও কারিকরপাড়া খালের অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। বিভিন্ন স্থানে খালের জায়গা দখল করে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। কোথাও কোথাও খালের প্রস্থ এতটাই কমে গেছে যে তা এখন সরু ড্রেনের মতো দেখায়। ময়ূর নদে পানি নিষ্কাশনের পথগুলোও বর্জ্যের স্তূপে বন্ধ হয়ে রয়েছে।
নিরালা এলাকার বাসিন্দা আব্দুস সাত্তার বলেন, আগে বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে যেত, কিন্তু এখন অল্প বৃষ্টিতেই পানি উপচে সড়কে উঠে আসে। বছরের পর বছর খাল খননের কথা শোনা গেলেও বাস্তবে এর সুফল মিলছে না।
গৃহিণী শিউলি বেগম অভিযোগ করেন, কয়েক বছর ধরে খালের মুখ বন্ধ থাকায় বর্ষা এলেই তাদের ঘরে পানি ঢুকে পড়ে। তালতলা এলাকার ব্যবসায়ী মো. জাকির হোসেন বলেন, খাল সংস্কারের নানা উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও পানি চলাচলের স্বাভাবিক পরিবেশ তৈরি হয়নি। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢোকার শঙ্কা তৈরি হয়।
খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে খাল খনন ও সংস্কার কাজে প্রায় ৪৮ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। তবে পরিবেশবাদীরা এ ব্যয়ের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) খুলনা জেলা সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, খাল পুনরুদ্ধারে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
কেসিসির প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবিরুল জব্বার জানান, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তবে টেকসই সুফল পেতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতাও জরুরি।
সম্প্রতি বিভিন্ন খাল পরিদর্শন শেষে খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু জানিয়েছেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল খনন, সংস্কার ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে এবং ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়ন করা হবে।
বর্তমানে খুলনা মহানগরীর ২২টি খালের মধ্যে ১৬টির দায়িত্বে রয়েছে কেসিসি এবং বাকি ছয়টি খালের দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। তবে বর্ষা ঘনিয়ে এলেও দুই সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের অভাব এবং খালগুলোর বেহাল অবস্থা নগরবাসীর উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

