টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলার খাল-বিল, জলাশয়ের পাড়, রাস্তার ধারে কিংবা ফসলের মাঠে একসময় সহজেই চোখে পড়ত ঢোলকলমি। গ্রাম্য ভাষায় কোথাও এটি ‘বেদমা’, আবার কোথাও ‘কুলুম গাছ’ বা ‘বেড়ালতা’ নামে পরিচিত। বর্তমানে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এই পরিচিত গাছটি আগের মতো আর তেমন দেখা যায় না। ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার প্রকৃতির এক অনন্য অনুষঙ্গ।
ঢোলকলমির বৈজ্ঞানিক নাম Ipomoea carnea। ইংরেজিতে এটি Pink Morning Glory নামে পরিচিত। গুল্মজাতীয় এই উদ্ভিদ লতার মতো বেড়ে ওঠে। এর হালকা বেগুনি রঙের ফুল দেখতে অনেকটা মাইকের আকৃতির হওয়ায় এটি সহজেই সবার নজর কাড়ে। ভোরে ফুটে ওঠা ফুলগুলো সন্ধ্যা পর্যন্ত সতেজ থাকে। একটি মঞ্জরিতে সাধারণত চার থেকে দশটি ফুল ফোটে। বর্ষার শেষ থেকে শীতকাল পর্যন্ত এ ফুল সবচেয়ে বেশি দেখা গেলেও বছরের প্রায় সব সময়ই কমবেশি ফুল ফোটে।
একসময় গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়ির বেড়া তৈরির প্রধান উপকরণ ছিল ঢোলকলমি। বসতবাড়ি, পুকুরপাড় ও ফসলের ক্ষেত ঘিরে এই গাছের বেড়া দেওয়া হতো। অনেকেই ঢোলকলমির সঙ্গে বাঁশের চটা কিংবা নেট ব্যবহার করে বেড়াকে আরও মজবুত করতেন। ঝাড় ঘন হয়ে গেলে কেটে রান্নার জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহার করা হতো। এখনও কিছু এলাকায় সেই প্রচলন রয়েছে।
গ্রামের অবহেলায় জন্ম নেওয়া এই গাছ শুধু সৌন্দর্যই বাড়াত না, পরিবেশের জন্যও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর কাণ্ড দিয়ে কাগজ তৈরি করা সম্ভব। দ্রুত বেড়ে ওঠার পাশাপাশি গাছের একটি ডাল মাটির সংস্পর্শ পেলেই নতুন গাছে পরিণত হয়। জমির ক্ষয়রোধ, প্রাকৃতিক বেড়া তৈরি এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ঢোলকলমির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফুলের মধুর টানে মৌমাছির আনাগোনা বাড়ে, আবার এর ডালে বসে বিভিন্ন কীটভুক পাখি পোকামাকড় শিকার করে।
তবে ঢোলকলমির বীজ ও পাতায় বিষাক্ত উপাদান এবং তেতো স্বাদের সাদা কষ থাকায় গরু-ছাগল এর পাতা খায় না। এ কারণেই এটি বেড়া তৈরির জন্য বেশ উপযোগী বলে বিবেচিত হয়। খরা ও বন্যা সহনশীল হওয়ায় প্রতিকূল পরিবেশেও সহজে টিকে থাকতে পারে এবং খাল-বিল, ডোবা কিংবা উন্মুক্ত স্থানে দ্রুত বংশবিস্তার করে।
নব্বইয়ের দশকে একটি গুজবের কারণে ঢোলকলমির ব্যাপক ক্ষতি হয়। সে সময় প্রচার করা হয়েছিল, এই গাছে থাকা এক ধরনের পোকা অত্যন্ত বিষাক্ত এবং এর কামড়ে মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এমনকি পোকার স্পর্শ লাগলেও বিষক্রিয়া হতে পারে—এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ায় দেশের বিভিন্ন স্থানে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে অসংখ্য ঢোলকলমি গাছ কেটে ফেলেন। পরে এসব তথ্যের সত্যতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠলেও ততদিনে গাছটির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
ধনবাড়ী উপজেলার হারিনাতেলি গ্রামের ৯৫ বছর বয়সী সাত্তার মন্ডল বলেন, “পাকিস্তান আমলে এত বেশি ঢোলকলমি ছিল যে বাড়ির চারপাশে আলাদা করে বেড়া দেওয়ার প্রয়োজন হতো না। রাস্তার পাশে কিংবা ধানের জমিতে এই গাছ লাগিয়ে দিতাম। ধানের সঙ্গে সঙ্গে এটিও বড় হয়ে সুন্দর বেড়ায় পরিণত হতো। ছোটবেলায় আমরা এর ফুল দিয়ে খেলাধুলা করতাম।”
প্রকৃতিপ্রেমী বাদল হোসেন বলেন, “একসময় আমাদের বাড়ির আশপাশ, রাস্তার ধারে ও খালপাড়ে অসংখ্য ঢোলকলমির গাছ ছিল। এখন সেই পরিচিত দৃশ্য আর চোখে পড়ে না। ধীরে ধীরে এটি হারিয়ে যাচ্ছে।”
স্থানীয়দের মতে, একসময় গ্রামবাংলার অপরিহার্য অংশ হয়ে থাকা ঢোলকলমি শুধু একটি আগাছা নয়; এটি পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও গ্রামীণ সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। তাই প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় এই মূল্যবান দেশীয় উদ্ভিদ সংরক্ষণ এবং নতুন করে রোপণে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।

