দেশে গত সাড়ে ছয় বছরে ১৬ হাজার ৬৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৫ হাজার ৭১২ জন নিহত এবং ১৪ হাজার ১৪৩ জন আহত হয়েছেন। ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত এসব দুর্ঘটনা ঘটেছে। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে।
শনিবার (৮ আগস্ট) গণমাধ্যমে পাঠানো বাংলাদেশ রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান প্রতিবেদনটি পাঠান।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালে দেশে ১ হাজার ৩৮১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৪৬৩ জন নিহত হন। ২০২১ সালে ২ হাজার ৭৮টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ২ হাজার ২১৪ জন। ২০২২ সালে দুর্ঘটনা ঘটে ২ হাজার ৯৭৩টি, এতে নিহত হন ৩ হাজার ৯১ জন। ২০২৩ সালে ২ হাজার ৫৩২টি দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৪৮৭ জন, ২০২৪ সালে ২ হাজার ৭৬১টি দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬০৯ জন এবং ২০২৫ সালে ৩ হাজার ২৯টি দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬৭১ জন নিহত হন। ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ১ হাজার ৩১১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১ হাজার ১৭৭ জন নিহত হয়েছেন।
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৩ হাজার ৫৪৮টি বা ২২ দশমিক ০৮ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে মুখোমুখি সংঘর্ষে। মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৫ হাজার ৪৯৭টি বা ৩৪ দশমিক ২১ শতাংশ। আর ভারী যানবাহনের ধাক্কায় ঘটেছে ৬ হাজার ৩১৪টি বা ৩৯ দশমিক ৩০ শতাংশ দুর্ঘটনা। অন্যান্য কারণে ঘটেছে ৭০৬টি দুর্ঘটনা।
দুর্ঘটনার জন্য দায়ী যানবাহনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে পণ্যবাহী যান। মোট দুর্ঘটনার ৪০ দশমিক ৩৪ শতাংশ বা ৬ হাজার ৪৮১টির জন্য ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, পিকআপ, ট্রাক্টর, ট্রলি ও লরিকে দায়ী করা হয়েছে। মোটরসাইকেল চালক এককভাবে দায়ী ৩৬ দশমিক ২৯ শতাংশ দুর্ঘটনার জন্য। এছাড়া বাস ১৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ, থ্রি-হুইলার ৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ এবং প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপ ২ দশমিক ৭২ শতাংশ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী।
সড়কের ধরন অনুযায়ী, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ৪১ দশমিক ৬৩ শতাংশ ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে। জাতীয় মহাসড়কে ঘটেছে ২৯ দশমিক ৭১ শতাংশ, শহরের সড়কে ১৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং গ্রামীণ সড়কে ১২ দশমিক ১৮ শতাংশ দুর্ঘটনা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আক্রান্তদের ৫৮ শতাংশের বয়স ১৩ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। দেশে নিবন্ধিত মোট মোটরযানের প্রায় ৭১ শতাংশই মোটরসাইকেল হওয়ায় এবং কিশোর-যুবকদের মধ্যে বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালানোর প্রবণতা বাড়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাশাপাশি গণপরিবহনের সীমাবদ্ধতা, যানজট ও মোটরসাইকেলের সহজলভ্যতাকে ব্যবহার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মতে, চার চাকার যানবাহনের তুলনায় মোটরসাইকেল প্রায় ৩০ গুণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমাতে মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংগঠনটি। তাদের দাবি, মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহার করলে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঝুঁকি ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
প্রতিবেদনে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে কিশোর-যুবকদের বেপরোয়া চালানো, ট্রাফিক আইন অমান্য, আইনের দুর্বল প্রয়োগ, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও নজরদারির ঘাটতি, সহজ ও সাশ্রয়ী গণপরিবহনের অভাব এবং অসহনীয় যানজটকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমাতে মোটরসাইকেলে নিরাপত্তা ও নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহার, মানসম্পন্ন হেলমেট বাধ্যতামূলক করা, ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো নির্মাণের সুপারিশ করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। পাশাপাশি সহজ, সাশ্রয়ী ও যাত্রীবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

