প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন তখনই টেকসই হবে, যখন দেশের তরুণরা সেই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেবে বলে মন্তব্য করেছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, সততা, সৃজনশীলতা ও দেশপ্রেমই আগামীর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি।
শনিবার গাজীপুরের কালিয়াকৈরে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি, বাংলাদেশের (ইউএফটিবি) ক্যাম্পাসে আয়োজিত ‘RoboFusion 1.0 – National Robotics Festival’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু প্রযুক্তিকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া নয়; বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে তরুণরা প্রযুক্তির ব্যবহারকারী থেকে উদ্ভাবকে পরিণত হবে। এ লক্ষ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবোটিক্স, সাইবার নিরাপত্তা, উদ্ভাবন, গবেষণা, স্টার্টআপ ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে জ্ঞানভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও উদ্ভাবনকেন্দ্রিক অর্থনীতি গড়ে তোলা। এ লক্ষ্য অর্জনে দক্ষ মানবসম্পদ, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা সৃষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু পাঠদান ও ডিগ্রি প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং শিল্প-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
ফকির মাহবুব আনাম বলেন, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর প্রযুক্তিগত সাফল্যের পেছনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা ও উদ্ভাবন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে একইভাবে গবেষণা ও উদ্ভাবনের নেতৃত্ব দিতে হবে।
বিশ্ব বর্তমানে প্রযুক্তিগত রূপান্তরের এক অভূতপূর্ব সময় অতিক্রম করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, অটোমেশন, ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), ক্লাউড কম্পিউটিং, সাইবার নিরাপত্তা, সেমিকন্ডাক্টর ও কোয়ান্টাম কম্পিউটিং আগামী দিনের অর্থনীতি, শিল্প, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ভিত্তি নির্ধারণ করবে। বাংলাদেশও এ বৈশ্বিক পরিবর্তনের অংশীদার।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে প্রযুক্তি শিক্ষা, গবেষণা, রোবোটিক্স, উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে ‘RoboFusion 1.0’ আয়োজনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তরুণদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, “প্রযুক্তিকে শুধু ব্যবহার করো না; প্রযুক্তি উদ্ভাবন করো।” শিক্ষার্থীদের গবেষণাগার থেকে নতুন প্রযুক্তি বের করে আনার পাশাপাশি উদ্ভাবনকে স্টার্টআপে রূপ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, সরকার এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তুলতে চায়, যারা শুধু চাকরির জন্য প্রস্তুত হবে না; বরং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোগ গড়ে তুলবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সক্ষমতা তুলে ধরবে।
তিনি জানান, সবার জন্য ইন্টারনেট নিশ্চিত করা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, ন্যানোটেকনোলজি ও সেমিকন্ডাক্টর খাতে সরকার বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে এবং বাংলাদেশ বৈশ্বিক প্রযুক্তি উন্নয়নের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে তাল মিলিয়ে চলতে পারবে।
স্টার্টআপ খাত প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ছোট ছোট উদ্ভাবনকে সফল উদ্যোগে পরিণত করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ ফান্ড ঘোষণা করেছেন। এ তহবিলের মাধ্যমে সম্ভাবনাময় উদ্ভাবনকে উদ্যোগে রূপান্তর করে মানুষের দোরগোড়ায় এর সুফল পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পখাতের মধ্যে কার্যকর অংশীদারিত্ব গড়ে তুলে একটি শক্তিশালী উদ্ভাবন-ইকোসিস্টেম নির্মাণে সরকার কাজ করছে। গবেষণা ও উদ্ভাবনে উৎসাহ, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশ, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্পখাতের সহযোগিতা, উদীয়মান প্রযুক্তির সম্প্রসারণ, সরকারি সেবা সহজীকরণ এবং সাইবার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, গাজীপুরের কালিয়াকৈর হাইটেক পার্কে জায়গা বরাদ্দ নেওয়ার পরও যেসব প্রতিষ্ঠান এখন পর্যন্ত শিল্প স্থাপন করেনি, তাদের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, কালিয়াকৈর হাইটেক পার্ক মন্ত্রণালয়ের একটি ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প। ইউরোপ, চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে এখানে বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে। এসব বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা নিশ্চিত করতে হবে।
মন্ত্রী আরও জানান, ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি, বাংলাদেশের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের জন্য দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মোক্তার আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মজিবুর রহমান, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. আবু ইউসুফ, গাজীপুরের জেলা প্রশাসক নুরুল করিম ভূইয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য এম এ মুবিন খান।
অনুষ্ঠানে শিক্ষাবিদ, গবেষক, শিল্পখাতের প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সদস্য, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, উদ্ভাবক, প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ, গণমাধ্যমকর্মী এবং ইউএফটিবি রোবোটিক্স ক্লাবের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

