গণতন্ত্রের মূল শক্তি গণমাধ্যম উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, গণতন্ত্রকে বাঁচাতে হলে গণমাধ্যমকেও বাঁচাতে হবে। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও সুশাসন নিশ্চিত করতে গণমাধ্যমকে সঠিক পথে থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের ম্যানেজিং কমিটির ১২ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি এসব কথা বলেন।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সঙ্গে নিজের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রেস ক্লাবের সঙ্গে তার সম্পর্ক শুধু রাজনৈতিক নয়, এটি দীর্ঘদিনের আত্মিক সম্পর্ক। তার সবচেয়ে দুঃসময়ে প্রেস ক্লাবের সদস্যরা পাশে ছিলেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সাংবাদিকদের কল্যাণে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমার জায়গা থেকে আপনাদের জন্য যেটুকু করার আছে, আপনারা নিশ্চিত থাকতে পারেন, আমি সেটুকু করার চেষ্টা করবো।’
এ সময় তিনি দৈনিক বাংলা-সহ বন্ধ থাকা অন্যান্য পত্রিকা পুনরায় চালুর উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সাংবাদিকদের কর্মসংস্থানের সংকট নিরসনে বন্ধ হয়ে যাওয়া পত্রিকাগুলো চালুর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বন্ধ পত্রিকাগুলো, বিশেষ ট্রাস্টের অধীনে থাকা পত্রিকাগুলো পুনরায় চালু করা গেলে অন্তত ১ হাজার সাংবাদিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।’
সাংবাদিক সমাজের মধ্যে ঐক্যের ওপর গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘সাংবাদিক সমাজের মধ্যে ঐক্য অত্যন্ত জরুরি, বিভক্তি কখনো সাফল্য এনে দিতে পারে না। আপনারা মৌলিক জায়গাগুলোতে এক হতে পারলে সরকার ও বিরোধী দলের সঙ্গেও কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারবেন।’
নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অনিয়ম ও গণহারে সাংবাদিক ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে তরুণ প্রজন্মের মন-মানসিকতায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতেও সাংবাদিকদের ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্র হচ্ছে একটা সংস্কৃতি। একে প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে হবে। সেজন্য মন-মানসিকতার ইতিবাচক পরিবর্তন করতে হবে।’
পুরোনো কর্তৃত্ববাদী চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধারণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মের মধ্যেও গণতান্ত্রিক ভাষা ও মানসিকতা তৈরি করা জরুরি। আন্দোলনের মাধ্যমে পরিবর্তন এলেও পুরোনো মানসিকতা থেকে গেলে প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব হবে না।
সরকারের যৌক্তিক ও গঠনমূলক সমালোচনার পাশাপাশি সরকারের ভালো কাজগুলোও গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যথাযথভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি। জনগণের নির্বাচিত সরকারকে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় সময় দেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
এ সময় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধসহ বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের বিষয়টি যথাযথভাবে গণমাধ্যমে তুলে ধরার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সুদীর্ঘ ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদানের কথা উল্লেখ করেন। দেশের গণমাধ্যমের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে জাতীয় প্রেস ক্লাবের উন্নয়নে সরকারের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয়ের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
সাক্ষাৎকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ রাষ্ট্রপতির সঙ্গে উপস্থিত সদস্যদের পরিচয় করিয়ে দেন এবং সংগঠনের পক্ষ থেকে তাকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। একই সঙ্গে সুবিধাজনক সময়ে প্রেস ক্লাবে যাওয়ার জন্য রাষ্ট্রপতিকে আমন্ত্রণ জানান তিনি।
প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভূঁইয়া অতীতের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘প্রেস ক্লাবে আপনি আমাদের পরিবারের একজন সদস্যের মতো ছিলেন। আমরা গর্বিত ও আনন্দিত যে, প্রেস ক্লাবেরই একজন রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে।’
সদস্য কাদের গনি চৌধুরী বিগত সময়ে অপসাংবাদিকতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার ধারা অব্যাহত রাখতে রাষ্ট্রপতির সহযোগিতা কামনা করেন।
সদস্য সৈয়দ আবদাল আহমদ রাষ্ট্রপতির সঙ্গে অতীতের স্মৃতিচারণ করেন এবং গণতন্ত্র রক্ষায় তার ত্যাগ ও অবদানের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, গত ১৭ বছর সাংবাদিকদের ওপর বিভিন্ন ধরনের বাধা ও নিয়ন্ত্রণ ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিকরা মুক্তভাবে লিখতে ও কথা বলতে পারছেন। এ স্বাধীনতা যেন অক্ষুণ্ন ও অব্যাহত থাকে, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেন তিনি।
এ সময় তিনি দ্রুত দশম ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নে সরকার ও রাষ্ট্রপতির সহযোগিতা কামনা করেন। পাশাপাশি প্রেস ক্লাবের অবকাঠামো সম্প্রসারণে সাংবাদিক নেতারা সহযোগিতা চাইলে রাষ্ট্রপতি এ বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের প্রতিনিধিদলে সভাপতি হাসান হাফিজ, সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভূঁইয়া, সদস্য কাদের গনি চৌধুরী, আবদুল হাই শিকদার, সৈয়দ আবদাল আহমদ, কাজী রওনাক হোসেন, জাহিদুল ইসলাম রনি, শাহনাজ বেগম পলি, মাসুমুর রহমান খলিলী ও এ কে এম মহসীন উপস্থিত ছিলেন।
সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব, সচিব ও প্রেস সচিবসহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।

