জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবিপ্রবি) শাখা ছাত্রদলের সদস্যসচিব যীনাত মিয়া আজিজুলের বিরুদ্ধে এক শিক্ষার্থীর করা হুমকি ও একাডেমিক ক্ষতির অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত কমিটি গঠন ছাড়াই অভিযোগটি ‘ভিত্তিহীন’ দাবি করে প্রতিবেদন দিয়েছে প্রক্টরিয়াল বডি। তবে অভিযোগকারী শিক্ষার্থীর দাবি, তার দেওয়া সুস্পষ্ট প্রমাণ ও সাক্ষীর বক্তব্য আমলে না নিয়ে তড়িঘড়ি করে অভিযুক্তকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এতে ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গত ১২ অক্টোবর ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী মো. রেজওয়ান হাসান প্রক্টর বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দেন। এতে বলা হয়, ছাত্রদল নেতা যীনাত মিয়া আজিজুল তাকে ডেকে নিয়ে গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) ভয় দেখান এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া, তার সঙ্গে থাকলে পরীক্ষা নম্বর বাড়িয়ে দেওয়া বা না থাকলে কমিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন বলে অভিযোগে জানান।
এ ঘটনার পর ১৪ অক্টোবর সাংবাদিকদের ডেকে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেয় প্রক্টরিয়াল বডি। ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর ড. মোহাম্মদ সাদীকুর রহমান জানান, অভিযোগকারী যেসব প্রমাণ ও সাক্ষ্য দিয়েছেন, তার সঙ্গে মূল অভিযোগের কোনো প্রাসঙ্গিকতা পাওয়া যায়নি। ব্যবস্থাপনা বিভাগের চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জানান, হুমকির অভিযোগে উল্লেখ করা সেই নির্দিষ্ট সময়ে তাদের মধ্যে কথা হলেও কোনো আক্রমণাত্মক শারীরিক ভঙ্গি (বডি ল্যাঙ্গুয়েজ) দেখা যায়নি।
তবে ব্যবস্থাপনা বিভাগের চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান সিসি ফুটেজ দেখলেও যে রুমে ঘটনা ঘটেছে তার কোন ফুটেজ প্রক্টরিয়াল বডির কেউ দেখেনি বলে জানান প্রক্টরিয়াল বডির কেউ। তার (আতিকুর রহমান) মৌখিক কথার উপর ভিত্তি করেই সংশ্লিষ্টতা নেই বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তারা।
প্রক্টরিয়াল বডি তাদের বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোডিং পরীক্ষা পদ্ধতিতে কোনো শিক্ষার্থীর নম্বর বাড়িয়ে বা কমিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। এ ধরনের অভিযোগ শিক্ষক সমাজের জন্য অপমানজনক। এছাড়া প্রশাসন উল্টো অভিযোগকারীর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কথা বিবৃতিতে তুলে ধরে। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন সহকারী প্রক্টর ড. আব্দুস সাত্তার এবং সহকারী প্রক্টর মোহাম্মদ হাসান।
শিক্ষার্থীর এমন গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষিতে কেন কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হলো না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর ড. সাদীকুর রহমান বলেন, “প্রশাসন মনে করেনি যে এটার জন্য তদন্ত কমিটি করার প্রয়োজন আছে। প্রক্টরিয়াল বডিই ফার্স্ট ডিফেন্স মেকানিজম এবং তারাই বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে।”
সহকারী প্রক্টর মোহাম্মদ হাসান জানান, আবেদনটি যথাযথ নিয়ম মেনে অর্থাৎ বিভাগীয় চেয়ারম্যানের মাধ্যমে (ফরওয়ার্ডিং দিয়ে) জমা দেওয়া হয়নি। তবে উপস্থিত সাংবাদিকরা প্রশ্ন তোলেন, কোনো লিখিত কারণ দর্শানোর নোটিশ বা আনুষ্ঠানিক তদন্ত কমিটি ছাড়া স্রেফ সিসিটিভির ফুটেজে ‘বডি ল্যাঙ্গুয়েজ’ দেখে এবং মৌখিক জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে এত বড় একটি অভিযোগ কীভাবে খারিজ করা যায়?
প্রক্টরিয়াল বডির এই যাচাই প্রক্রিয়ায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিযোগকারী শিক্ষার্থী মো. রেজওয়ান হাসান। তিনি বলেন, “আমি আমার দাবির সপক্ষে চাক্ষুষ সাক্ষী নিয়ে গিয়েছিলাম। সাক্ষী পুরো ঘটনার বর্ণনা দেওয়ার পরও তারা বলছে কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। আজ সকাল ১১টার দিকে তদন্ত কমিটি গঠনের আবেদন পত্র প্রক্টর স্যারের কাজে জমা দিতে গেলেও তিনি জমা নেন নি উল্টো আমাকে নানান প্রশ্ন করতে থাকেন এবং ১২টার মধ্যে সব প্রমাণ হাজির করার জন্য চাপ দেওয়া হয়।”
রেজওয়ান আরো বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনই যদি সব সত্য জানার পর আমার পাশে না থাকে, তাহলে আমি ক্যাম্পাসে নিরাপদ বোধ করছি না। তারা আমার সব কথা উল্টে দিয়ে নিজেদের মতো করে প্রকাশ করেছে।”
অন্যদিকে, নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ শুরু থেকেই অস্বীকার করে আসছেন জাবিপ্রবি ছাত্রদলের সদস্যসচিব যীনাত মিয়া আজিজুল। প্রক্টরিয়াল বডির সিদ্ধান্তের পর তিনি বলেন, “এটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং আমার দলকে হেয় করার ষড়যন্ত্র। আমি একটি প্লাস্টিক বর্জন ও মাদকবিরোধী কর্মসূচির জন্য সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে সবাইকে আহ্বান জানিয়েছিলাম, কাউকে জোর করিনি।”
প্রক্টরিয়াল বডির পদক্ষেপে সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, “আমার যদি এমন ক্ষমতা থাকত যে আমি নম্বর বাড়িয়ে-কমিয়ে দেব, তাহলে তো ক্যাম্পাসে রাজ করতাম। একজন জুনিয়র শিক্ষার্থীর সঙ্গে উচ্চস্বরে কথা বলার বা ভয়ভীতি দেখানোর কোনো কারণ আমার নেই।”
একটি সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রশাসনের এমন দ্রুতগতির যাচাই-বাছাই এবং নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন না করার বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতে, অভিযোগ সত্য হোক বা মিথ্যা, একটি আনুষ্ঠানিক তদন্ত কমিটির মাধ্যমে এর সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ সমাধান হওয়া উচিত ছিল।

