মিয়ানমার সীমান্ত থেকে ছোড়া গুলিতে গুরুতর আহত টেকনাফের শিশু হুজাইফা আফনান দীর্ঘ ২৭ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে না ফেরার দেশে চলে গেছে। শনিবার সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে ঢাকার জাতীয় ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
হুজাইফার চাচা শওকত আলী বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, শনিবার সকালে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, “আমার ভাতিজির মরদেহ বাড়িতে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। সবাই তার জন্য দোয়া করবেন।”
গত ১১ জানুয়ারি সকালে টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের তেচ্ছিব্রিজ এলাকায় নিজ বাড়ির পাশে অবস্থানকালে মিয়ানমারের দিক থেকে ছোড়া গুলিতে গুরুতর আহত হয় ১২ বছর বয়সী হুজাইফা আফনান। সে স্থানীয় বাসিন্দা জসিম উদ্দিনের মেয়ে। গুলিটি তার মাথায় বিদ্ধ হয়, যা সঙ্গে সঙ্গে তাকে সংকটাপন্ন অবস্থায় ফেলে দেয়।
প্রথমে তাকে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হলেও অবস্থার অবনতি হলে সেদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা জানান, মাথায় ঢুকে যাওয়া গুলিটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে থাকায় তা অপসারণ করা সম্ভব হয়নি। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৩ জানুয়ারি বিকেলে তাকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অ্যানেসথেসিয়া ও আইসিইউ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক হারুন অর রশিদ সে সময় গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, হুজাইফার মস্তিষ্কে ঢুকে যাওয়া গুলিটি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বের করা ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সম্ভব হয়নি। তবে মস্তিষ্কের চাপ কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল।
দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর শনিবার সকালে হুজাইফা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে।
হুজাইফার মৃত্যুতে টেকনাফসহ আশপাশের এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পৃথক শোকবার্তায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজার-৪ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী এবং জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী নুর আহমদ আনোয়ারী গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁরা হুজাইফার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং নিহত শিশুটির আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।
একই সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দারা সীমান্ত এলাকায় নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের জরুরি ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
সম্প্রতি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংঘাত আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। বিমান হামলা, ড্রোন আক্রমণ, মর্টার শেল নিক্ষেপ ও বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। বিশেষ করে মংডু টাউনশিপ এলাকায় আরাকান আর্মির (এএ) অবস্থান লক্ষ্য করে জান্তা বাহিনীর বিমান হামলা জোরদার হয়েছে। বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষে সীমান্ত পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে।
এই সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জনপদে। টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় গোলার বিকট শব্দে ঘরবাড়ি কেঁপে উঠছে। ছোড়া গুলি এসে পড়ছে বসতবাড়ি, চিংড়িঘের ও নাফ নদীতে। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
হুজাইফার মৃত্যু সেই উদ্বেগকে আরও গভীর করল বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

