বর্তমান সময়ে এসে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে— ‘বাংলাদেশের তরুণরা কেমন?’ তাহলে সৎ উত্তর হবে: ‘তারা একই সাথে ভবিষ্যৎ, হতাশা, সম্ভাবনা, বেকারত্ব আর ফেসবুক কমেন্ট সেকশনের প্রধান স্টেকহোল্ডার।‘ বিশ্ব যেখানে তরুণদের নিয়ে ভাবছে Innovation, AI, Green Economy— বাংলাদেশ সেখানে ভাবছে—“এই ছেলেটার চাকরি কবে হবে?” এই লেখাটি তাই কোনো অনুপ্রেরণামূলক নয়, বরং আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখার চেষ্টা।
বাংলাদেশে তরুণ মানেই সংখ্যার পাহাড়। ১৫–২৯ বছরের তরুণ প্রায় ৪৫ মিলিয়ন। অর্থনীতিবিদরা একে বলেন Demographic Dividend। কিন্তু বাস্তবে এই ডিভিডেন্ড অনেকটা লটারি টিকিটের মতো—জেতার সম্ভাবনা আছে, কিন্তু কাটলেই যে জিতব এমন না। বিশ্বের অনেক দেশ এই তরুণ শক্তিকে ব্যবহার করেছে—দক্ষিণ কোরিয়া শিল্পে, ভিয়েতনাম উৎপাদনে, এস্তোনিয়া ডিজিটালে। আর আমরা? বিসিএস কোচিং সেন্টারে।
বাংলাদেশি তরুণদের সবচেয়ে প্রিয় বাক্য ‘ভাই, পড়াশোনা তো শেষ।‘ কিন্তু সমস্যা হলো—বিশ্ব এখন জিজ্ঞেস করে না, ‘তুমি কী পড়েছ?’ বিশ্ব জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি কী করতে পারো?’
আমাদের তরুণদের হাতে সার্টিফিকেট আছে, মার্কশিট আছে, আত্মবিশ্বাস আছে, কিন্তু নেই সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, টিমওয়ার্ক, বাস্তব অভিজ্ঞতা। ফলে দৃশ্যটা এমন দাঁড়ায় যে, একজন বাংলাদেশি গ্র্যাজুয়েট এক হাতে সিভি আরেক হাতে ভাগ্যের লাঠি নিয়ে ঘুরছে। বিশ্বের তরুণরা যখন ইন্টার্নশিপে problem solve করছে, আমাদের তরুণ তখন problem explain করছে মামার বন্ধুর কাছে।
বিশ্বে তরুণ বেকারত্ব গড়ে ২০–২২%, আর বাংলাদেশে NEET (Not in Education, Employment or Training) প্রায় ৪০%। মানে প্রতি ১০ জন তরুণের ৪ জন কোনো ট্রেনে নেই, শুধু প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ঘোষণা শুনছে। চাকরির বিজ্ঞপ্তি পড়ে বাংলাদেশি তরুণ ভাবে, ‘এই চাকরিটা তো আমার জন্যই বানানো।‘ তারপর নিচে দেখে—৫ বছরের অভিজ্ঞতা, বয়স সর্বোচ্চ ৩০, ‘ডায়নামিক‘ হতে হবে। ফলাফল—ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েটরা ফ্রেশই থাকে—চিরদিন।
বিশ্বের তরুণরা প্রশ্ন করে, চ্যালেঞ্জ করে, সিস্টেম ভাঙে। বাংলাদেশি তরুণরা মানিয়ে নেয়, অপেক্ষা করে, পোস্ট শেয়ার করে। ইউরোপের তরুণ বলে, ‘Work-life balance চাই।‘ বাংলাদেশি তরুণ বলে, ‘কাজটাই আগে পাই।‘ চীনের তরুণ AI নিয়ে চিন্তিত, আমাদের তরুণ চিন্তিত, ‘ভাই, ভাইভা বোর্ডে কী জিজ্ঞেস করে?’
বাংলাদেশের ইতিহাসে তরুণদের ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে গণঅভ্যুত্থান সবখানেই তরুণরা ছিল অগ্রভাগে। কিন্তু শিক্ষা, ক্যারিয়ার ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে সেই ধারাবাহিকতা কোথাও যেন বাধাগ্রস্ত হয়। তরুণরা রাস্তায় নামতে জানে, কিন্তু নীতিনির্ধারণের টেবিলে তাদের উপস্থিতি এখনো সীমিত। বাংলাদেশি তরুণরা হাসিখুশি—মেম বানাতে জানে, রিল বানাতে জানে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে অনিশ্চয়তা, তুলনা, ব্যর্থতার ভয় রয়েই যায়। এই সমস্যাগুলোতে বিশ্বে তরুণরা থেরাপিস্টের কাছে যায়, আর আমাদের তরুণরা ভাবে, ‘একটু ঘুমাইলে ঠিক হয়ে যাবে।‘
এত কিছুর পরও একটা কথা সত্য—বাংলাদেশি তরুণরা অসাধারণভাবে প্রাণোচ্ছল। কম সুযোগে মানিয়ে নেওয়া, কম রিসোর্সে বাঁচা আর সীমিত জায়গায় স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা—এগুলো বিশ্বমানের স্কিল। সমস্যা তরুণে না, সমস্যা নীতিতে, পরিকল্পনায়, সিস্টেমে।
শেষ কথা: তরুণ মানেই সমস্যা না, প্রশ্ন। বাংলাদেশের তরুণরা কোনো বোঝা নয়, তারা প্রশ্ন। প্রশ্ন হলো—আমরা কি তাদের প্রস্তুত করছি? নাকি শুধু আশ্বাস দিচ্ছি? তারা কি ভবিষ্যৎ গড়বে, নাকি ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষা করবে? বিশ্ব এগোচ্ছে দ্রুত, বাংলাদেশের তরুণও প্রস্তুত। এখন দরকার তাদের ‘চুপ করে সহ্য করো‘ না বলে ‘এসো, গড়ি‘ বলা। না হলে ২০৩৫ সালে আমরা বলব—’আমাদের তরুণরা অনেক ভালো ছিল…কিন্তু সময়টা ভালো ছিল না।‘ আর ইতিহাস কখনোই এই অজুহাত মেনে নেয় না।

