মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত মরুর বুকে যখন বারুদের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে, তখন তার উত্তাপ যে হাজার মাইল দূরের বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের রান্নাঘর কিংবা মোটরসাইকেলের ট্যাঙ্কি পর্যন্ত পৌঁছে যাবে, তা হয়তো অনেকেই আগেভাগে আঁচ করতে পারেননি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুরু হওয়া সামরিক সংঘাত আজ আমাদের জাতীয় জীবনের এক গভীর সংকটের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজধানী ঢাকার রাজপথ থেকে শুরু করে অজপাড়াগাঁয়ের সেচ পাম্প-সর্বত্রই আজ একই হাহাকার এবং দীর্ঘশ্বাস। জ্বালানি তেলের এই তীব্র সংকট কেবল যাতায়াত ব্যবস্থাকেই স্থবির করে দেয়নি, বরং এটি আমাদের সামগ্রিক অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং আসন্ন ঈদের আনন্দকেও এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বর্তমান বিশ্বে জ্বালানি তেল কেবল একটি পণ্য নয়, এটি যেকোনো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মেরুদণ্ড। কিন্তু ইরান ও পশ্চিমা শক্তির মধ্যকার এই সংঘাত বিশ্ববাজারে যে সুনামি তৈরি করেছে, তাতে কেবল বাংলাদেশ নয়, পুরো বিশ্বই আজ টালমাটাল। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানের প্রধান জ্বালানি কেন্দ্রগুলোতে দফায় দফায় হামলা এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরির ফলে প্রতিদিন বিশ্ববাজারে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ ব্যারেল তেলের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। ইরান বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশ এবং তাদের খনি ও শোধনাগারগুলোতে হামলার ফলে যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তার প্রভাব সরাসরি পড়ছে আমাদের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর।
লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো তাদের রুট পরিবর্তন করে আফ্রিকার চারপাশ ঘুরে যাতায়াত করছে, যার ফলে পরিবহন খরচ বেড়েছে প্রায় চারগুণ। এই বাড়তি খরচ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা আমাদের দেশের পাম্পগুলোতে হাহাকারের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেবল বাংলাদেশ নয়, এই সংকটের প্রভাব বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তেও দৃশ্যমান। প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানে তেলের জন্য মানুষ কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছে, অনেক দেশে রেশনিং পদ্ধতিতে তেল বিক্রি শুরু হয়েছে। এমনকি উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতেও তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার কারণে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। ইউরোপের অনেক দেশ এখন বিকল্প জ্বালানির সন্ধানে মরিয়া হয়ে উঠেছে, কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে এই বিশাল ঘাটতি মেটানো কারও পক্ষেই সম্ভব হচ্ছে না। আমাদের দেশে সংকটের চিত্রটি আরও করুণ। রাজধানীর পাম্পগুলোর সামনে তেলের জন্য যে মাইলের পর মাইল দীর্ঘ সারি আমরা দেখছি, তা আসলে আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তার এক নগ্ন চিত্র।
একজন সাধারণ পাঠাও চালক কিংবা মধ্যবিত্ত প্রাইভেট কার মালিক যখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে পুড়ে সামান্য কয়েক লিটার তেলের জন্য অপেক্ষা করেন, তখন বুঝতে হবে সংকটটি কেবল সরবরাহের নয়, বরং আস্থারও। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে দেশে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে এখন একটাই প্রশ্ন-যদি মজুত থাকেই, তবে পাম্পগুলো ‘তেল নেই’ বোর্ড ঝুলিয়ে দিচ্ছে কেন? এই বৈপরীত্যই সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্কের জন্ম দিচ্ছে। মানুষ ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার কথা ভেবে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি মজুত করতে চাইছে, যা বিদ্যমান সংকটকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি ও শিল্প আজ বড় ধরনের হুমকির মুখে। বর্তমানে বোরো আবাদের ভরা মৌসুম চলছে এবং বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কৃষকরা এখন সেচ যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল, যা চলে মূলত ডিজেলে। পাম্পে ডিজেল না থাকা মানে হলো শস্যক্ষেত ফেটে চৌচির হওয়া। তেলের অভাবে যদি সেচ ব্যাহত হয়, তবে আগামী মৌসুমে চালের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে চালের বাজারে, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।
অন্যদিকে, তৈরি পোশাক শিল্পের চাকা ঘোরে জেনারেটরের ওপর ভিত্তি করে। ডিজেল না পেয়ে কারখানাগুলোতে উৎপাদন ৩০ শতাংশের বেশি কমে যাওয়া মানে হলো বিশ্ববাজারে আমাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারানো। এটি কেবল মালিকের ক্ষতি নয়, বরং জাতীয় আয়ের ওপর এক বড় আঘাত। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, যেকোনো জাতীয় দুর্যোগ বা সংকট একদল অসাধু মানুষের জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসে। যখন পাম্পগুলো সাধারণ মানুষের কাছে তেল বিক্রি বন্ধ করে দিচ্ছে, তখন পর্দার আড়ালে ড্রাম ভরে তেল চলে যাচ্ছে কালোবাজারে। অলিগলিতে দ্বিগুণ দামে তেল বিক্রির যে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, তা ভাঙার জন্য কঠোর প্রশাসনিক নজরদারির বিকল্প নেই। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ডিপো থেকে তেল ছাড় হলেও তা পাম্প পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই গায়েব হয়ে যাচ্ছে। এই কৃত্রিম সংকট তৈরি করে যারা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া না গেলে সরকারের কোনো উদ্যোগই সফল হবে না।
সামনে পবিত্র ঈদুল ফিতর, যা আমাদের দেশে বিশাল এক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সময়। তেলের সংকটের কারণে পরিবহন মালিকরা ইতিমধ্যে বাসের সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছেন। এর ফলে নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা লাখ লাখ মানুষের ঈদযাত্রা এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে যাচ্ছে। একদিকে টিকিটের বাড়তি দাম, অন্যদিকে যানজট আর তেলের অভাবে মাঝপথে গাড়ি বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা-সব মিলিয়ে মানুষের মনে ঈদের আনন্দের চেয়ে উদ্বেগই এখন বেশি। আমাদের এই সংকটের মূলে রয়েছে ডলার সংকট এবং লোহিত সাগরের অস্থিরতা। যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, ফলে শিপিং খরচ ও বীমা ব্যয় আকাশচুম্বী হয়ে পড়েছে। ইরান যুদ্ধে ইতিমধ্যে সেদেশের তেল অবকাঠামোর যে ক্ষতি হয়েছে, তা পুনরুদ্ধার করতে দীর্ঘ সময় লাগবে, যার অর্থ হলো এই সংকট দ্রুত কাটছে না।
ভারত বা রাশিয়ার মতো বিকল্প উৎস থেকে জি-টু-জি ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি চুক্তি করার যে আলাপগুলো আগে হয়েছিল, তার কার্যকর প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি। বৈশ্বিক রাজনীতির এই পাশাখেলায় আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশকে টিকে থাকতে হলে দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি কৌশলের কোনো বিকল্প নেই। জ্বালানি তেল একটি দেশের জীবনীশক্তির মতো এবং এই শক্তি যখন থমকে যায়, তখন পুরো দেশ স্থবির হয়ে পড়ে। আমরা চাই না আমাদের রাজপথগুলোতে মানুষের ক্ষোভ আর হাহাকার আরও দীর্ঘ হোক। সরকারের উচিত কালক্ষেপণ না করে জরুরি ভিত্তিতে আমদানিকৃত তেলের জাহাজগুলো দ্রুত খালাসের ব্যবস্থা করা এবং পাম্পগুলোতে স্বচ্ছতার সঙ্গে তেল বণ্টন নিশ্চিত করা। পাশাপাশি, প্রতিটি নাগরিককেও দায়িত্বশীল হতে হবে এবং আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল মজুত করার মানসিকতা পরিহার করতে হবে।
বিশ্ব রাজনীতির যে দাবানল আজ আমাদের দোরগোড়ায়, তাকে রুখতে হলে প্রয়োজন ইস্পাতকঠিন জাতীয় ঐক্য এবং সৎ ও দূরদর্শী নেতৃত্ব। অন্যথায়, তেলের এই হাহাকার কেবল যাতায়াত ব্যবস্থায় নয়, বরং আমাদের জীবনযাত্রার প্রতিটি স্তরে বড় ধরনের ক্ষত তৈরি করবে। আজ যে সংকটকে আমরা কেবল রাস্তার জ্যাম বা পাম্পের লাইন হিসেবে দেখছি, তা দ্রুত সমাধান না হলে কাল তা বড় ধরনের সামাজিক অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে। আমাদের নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, সাধারণ মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলে তা সামলানো যেকোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। তাই আসন্ন ঈদের আগেই জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

