ইতিহাসের চাকা কি তবে উল্টো পথে ঘুরতে শুরু করেছে নাকি নব্বইয়ের দশকের সেই পুরনো উপসাগরীয় যুদ্ধ মডেলকে নতুন মোড়কে বর্তমানের ডিজিটাল ও ড্রোন যুদ্ধের যুগে ফিরিয়ে আনতে চাইছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই প্রশ্ন এখন বিশ্বজুড়ে। ৩২ দিন পার হতে যাওয়া ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি এখন আর কেবল ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা কিংবা ড্রোনের বিধ্বংসী ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই বরং এই যুদ্ধ এখন মোড় নিয়েছে এক বিশাল অর্থনৈতিক সমীকরণের দিকে। ওয়াশিংটনের করিডোর থেকে আসা সর্বশেষ ইঙ্গিত বলছে হোয়াইট হাউস এই যুদ্ধের কয়েক হাজার কোটি ডলারের খরচ মধ্যপ্রাচ্যের ধনী আরব দেশগুলোর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার গোপন ছক কষছে যা ট্রাম্পের নয়া মার্সেনারি কূটনীতি হিসেবেই পরিচিতি পাচ্ছে। এই নীতি কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয় বরং বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকেই এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের অগ্নিগর্ভ ভবিষ্যৎকে আরও ত্বরান্বিত করছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদেও বারবার বলেছিলেন যুক্তরাষ্ট্র আর বিশ্বের পুলিশ হবে না এবং এবার দ্বিতীয় মেয়াদে এসে তিনি সেই অবস্থানকে আরও চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট গত সোমবার যে ইঙ্গিত দিয়েছেন তা মধ্যপ্রাচ্যের রাজতান্ত্রিক দেশগুলোর জন্য এক অশনি সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে কারণ লেভিট স্পষ্ট করেছেন যে ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন মিত্রদের এই যুদ্ধের ব্যয়ভার বহনে সরাসরি আহ্বান জানাতে পারেন। ১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে কুয়েতকে মুক্ত করার নামে যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরাকের বিরুদ্ধে জোট গঠন করেছিল তখন জার্মানি ও জাপানের মতো দেশগুলো প্রায় ৫ হাজার ৪০০ কোটি ডলার দিয়েছিল যা বর্তমান মূল্যে ১৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের সমান। কিন্তু সেই যুদ্ধ ছিল কুয়েতের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য একটি আন্তর্জাতিক জোটবদ্ধ প্রয়াস অথচ বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যে আগ্রাসন শুরু করেছে তা অনেকটা একতরফা এবং ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছে বিশ্ব সম্প্রদায়। বিশেষ করে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রভাবে ট্রাম্প প্রশাসন যেভাবে ইরানে হামলা শুরু করেছে তাতে আরব দেশগুলো সরাসরি অংশ না নিলেও এখন তাদের ওপর যুদ্ধের বিল চাপানোর চেষ্টা চলছে যা মূলত এক ধরণের অর্থনৈতিক ব্ল্যাকমেইল। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ডানপন্থী সমালোচক শন হ্যানিটি সরাসরি বলেছেন ইরানকেই তেলের মাধ্যমে এই যুদ্ধের খরচ মেটাতে হবে কিন্তু বাস্তবতা হলো ইরান এই প্রস্তাব কেবল প্রত্যাখ্যানই করেনি উল্টো তাদের নিজস্ব ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। এমতাবস্থায় ট্রাম্পের চোখ এখন সৌদি আরব, কাতার বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোর উদ্বৃত্ত তহবিলের দিকে এবং এটিই তার মার্সেনারি বা ভাড়াটে সৈন্যনীতির আধুনিক সংস্করণ।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের দেওয়া তথ্যমতে যুদ্ধের ব্যয় এখন আকাশচুম্বী এবং যুদ্ধের প্রথম ৬ দিনেই খরচ হয়েছিল ১ হাজার ১৩০ কোটি ডলার যা ১২তম দিনে বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ১ হাজার ৬৫০ কোটি ডলারে। যুদ্ধের ৩২তম দিনে এই অংকটি যে কত বিশাল তা কল্পনা করলে গা শিউরে ওঠে কারণ হোয়াইট হাউস কংগ্রেসের কাছে ইতিমধ্যেই অতিরিক্ত ২০ হাজার কোটি ডলারের সামরিক বাজেট চেয়েছে। এই বিশাল অঙ্কের অর্থ ট্রাম্প কোথা থেকে আনবেন সেই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে আরব দেশগুলোর ওপর চাপের কৌশল। মার্কিন অর্থনীতি যখন মূল্যস্ফীতির চাপে জর্জরিত তখন নিজের দেশের করদাতাদের ওপর এই যুদ্ধের বোঝা না চাপিয়ে তিনি এটি আউটসোর্সিং করতে চাইছেন যা বিশ্ব কূটনীতিতে এক নজিরবিহীন ও নেতিবাচক উদাহরণ হয়ে থাকবে।
আরব দেশগুলো জানে একবার যদি তারা এই যুদ্ধের অর্থায়ন শুরু করে তবে এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা চিরতরে নষ্ট হবে কারণ ইরানের পাল্টা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বিমানবন্দর, হোটেল এবং জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আরব দেশগুলো যদি যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থ দেয় তবে ইরান তাদের সরাসরি শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করবে যা আঞ্চলিক প্রক্সি ওয়ারকে সরাসরি মহাযুদ্ধে রূপান্তর করতে পারে এবং এর ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য একটি আগ্নেয়গিরির মুখে পতিত হবে। যুদ্ধের ৩২তম দিনে সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে কারণ ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ এখন অবরুদ্ধ এবং আমেরিকার অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে যুক্তরাষ্ট্রে এক গ্যালন পেট্রলের দাম ৪ ডলার ছাড়িয়েছে যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলছে।
ক্যারোলিন লেভিট দাবি করেছেন যে জ্বালানির এই দাম বৃদ্ধি সাময়িক এবং ইরানকে দুর্বল করার দীর্ঘমেয়াদি লাভ এই সাময়িক কষ্টের চেয়ে অনেক বেশি কিন্তু এই তাত্ত্বিক লাভ সাধারণ ভোক্তাদের কোনো উপকারে আসছে না। বিশ্ব নেতারা ইতিমধ্যেই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বিশ্ব অর্থনীতি ১৯৩০ সালের মতো এক মহাবিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হতে পারে। ট্রাম্পের এই আগ্রাসী নীতি এবং যুদ্ধের খরচ অন্যদের ওপর চাপানোর প্রচেষ্টায় বিশ্ব নেতারা বিভক্ত হয়ে পড়েছেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কর্মকর্তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে তারা এই যুদ্ধে কোনো ধরণের আর্থিক সহযোগিতা দেবে না। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ এবং জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎস উভয়ই কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন কারণ তাদের মতে ইরানের ওপর হামলা কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয় বরং ইউরোপে নতুন করে শরণার্থী সংকট এবং জ্বালানি নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলবে।
অন্যদিকে চীন ও রাশিয়া এই যুদ্ধকে সরাসরি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে এবং ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু করে অন্য দেশের পয়সায় যা তাদের দীর্ঘদিনের অভ্যাস। চীন ইতিমধ্যেই ইরানের সাথে তাদের কৌশলগত অংশীদারিত্ব বজায় রাখার ঘোষণা দিয়েছে এবং হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরণের হস্তক্ষেপের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে যা বৈশ্বিক মেরুকরণকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান এই যুদ্ধ অঞ্চলকে ধ্বংস করার একটি সুগভীর পরিকল্পনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ইরান বারবার দাবি করছে, তারা কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যেই প্রথমে আক্রান্ত হয়েছে এবং তেহরানের ভাষ্যমতে তারা যুক্তরাষ্ট্র বা এই অঞ্চলের জন্য কোনো হুমকি ছিল না।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি আগ্রাসনের জবাবে ইরান যে সামরিক সক্ষমতা দেখিয়েছে তা বিশ্বকে অবাক করেছে কারণ ইরান কেবল নিজের সীমান্তে যুদ্ধ সীমাবদ্ধ রাখেনি বরং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হানা দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন ও ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে। ইরানি নেতৃত্বের স্পষ্ট কথা হলো যুদ্ধবিরতি হতে হলে কেবল যুক্তরাষ্ট্রকে হামলা বন্ধ করলেই হবে না বরং গত ৩২ দিনে ইরানের যে বিপুল অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তার পূর্ণ ক্ষতিপূরণ ওয়াশিংটনকে দিতে হবে। ট্রাম্প যেখানে আরবদের কাছ থেকে টাকা চাইছেন সেখানে ইরান সরাসরি ওয়াশিংটনের কাছে বিল পাঠাচ্ছে যা এক অদ্ভুত ও জটিল কূটনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। এই দুই বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা দিন দিন ক্ষীণ হয়ে আসছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ আরও বেশি কালো মেঘে ঢাকা পড়ছে।
এই যুদ্ধের ফলাফল যাই হোক না কেন এর ভবিষ্যৎ প্রভাব হবে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী এবং ধ্বংসাত্মক। প্রথমত মার্কিন ডলারের একক আধিপত্য বা পেট্রো-ডলার সিস্টেম এই যুদ্ধের ফলে বড় ধরণের ধাক্কা খেতে পারে কারণ যদি আরব দেশগুলো ট্রাম্পের অন্যায্য আর্থিক দাবি মানতে অস্বীকৃতি জানায় তবে তারা বিকল্প মুদ্রা বা ব্রিকসের মতো জোটের দিকে আরও বেশি ঝুঁকবে যা আমেরিকার অর্থনৈতিক পতনকে ত্বরান্বিত করবে। দ্বিতীয়ত মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য আমূল বদলে যাবে এবং ইসরায়েল ও ইরানের এই সরাসরি সংঘাত পুরো অঞ্চলকে দুটি স্পষ্ট ব্লকে ভাগ করে দিচ্ছে যার একদিকে ইসরায়েল ও তার পশ্চিমা মিত্ররা এবং অন্যপাশে ইরান ও তার প্রতিরোধের অক্ষ দাঁড়িয়ে আছে। মাঝখানে পড়ে আরব দেশগুলো তাদের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিয়ে চরম শঙ্কিত কারণ তারা দেখছে, যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনে তাদের কেবল একটি এটিএম বুথ হিসেবে ব্যবহার করতে চায় যা দীর্ঘদিনের মিত্রতার ওপর এক বিশাল আস্থার সংকট তৈরি করেছে। ট্রাম্পের এই মার্সেনারি কূটনীতি মূলত এক ধরণের ভূ-রাজনৈতিক জুয়া যেখানে তিনি চাচ্ছেন সাপের মাথায় আঘাত করতে অথচ লাঠিটা যেন হয় অন্যের কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল ও সংবেদনশীল। আজকের ইরান সামরিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং আজকের আরব বিশ্ব আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক ও সচেতন। যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে, তারা কেবল ধমক দিয়ে বা আহ্বানের আড়ালে কোটি কোটি ডলার আরবদের কাছ থেকে আদায় করে নেবে তবে তারা এক ঐতিহাসিক ভুল করছে। যুদ্ধের এই ৩২তম দিনে এসে এটি স্পষ্ট, এই লড়াইয়ে কোনো পক্ষই বিজয়ী হিসেবে বের হতে পারবে না বরং ধ্বংস হবে অবকাঠামো এবং প্রাণ হারাবে হাজার হাজার নিরীহ মানুষ যার দায়ভার শেষ পর্যন্ত ইতিহাস ট্রাম্পের ওপরই চাপাবে। ইতোমধ্যেই ২ হাজার ইরানি নিহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে এবং বেসামরিক স্থাপনাসহ হোটেল ও বিমানবন্দর ইরানি হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে যা যুদ্ধের বীভৎসতাকে তুলে ধরছে।
ট্রাম্পকে বুঝতে হবে যে অর্থ দিয়ে অস্ত্র কেনা যায় কিন্তু শান্তি কেনা যায় না এবং আরব দেশগুলোর সম্পদের ওপর চোখ না দিয়ে বরং কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং আগ্রাসন বন্ধ করাই এখন বিশ্ববাসীর একমাত্র প্রত্যাশা। অন্যথায় এই আগুনের লেলিহান শিখা কেবল তেহরান বা ওয়াশিংটনকে নয় বরং পুরো বিশ্বসভ্যতাকে ভস্মীভূত করে ছাড়বে এবং আগামী প্রজন্ম এই সময়কে দেখবে এক চরম মূর্খতা ও দম্ভের ইতিহাস হিসেবে। মধ্যপ্রাচ্যের অগ্নিগর্ভ ভবিষ্যৎ এখন এক সুতোয় ঝুলছে যেখানে ট্রাম্পের প্রতিটি পদক্ষেপ কেবল রক্তের হোলি খেলাই নয় বরং বিশ্ব অর্থনীতির কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়ার নামান্তর হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরব শাসকেরা বর্তমানে যে নীরবতা পালন করছেন তা ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা কি না সেটিই এখন দেখার বিষয় তবে মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ মানুষের মনে যে ক্ষোভের সঞ্চার হচ্ছে তা যে কোনো সময় এক গণবিস্ফোরণের জন্ম দিতে পারে যা ট্রাম্পের সমস্ত হিসাব-নিকাশ পাল্টে দেবে।
এই অন্ধকার সময়ে বিশ্ব শান্তি রক্ষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে হবে এবং ট্রাম্পের এই একতরফা যুদ্ধবাজি থামানোর জন্য সম্মিলিত চাপ প্রয়োগ করতে হবে নতুবা মানবজাতিকে এক অপূরণীয় মূল্য চোকাতে হবে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই কৌশল যদি সফল হয় তবে তা হবে আন্তর্জাতিক আইনের মৃত্যু এবং পেশী শক্তির এক নতুন ও ভয়ংকর অধ্যায়ের সূচনা যা কোনো সভ্য রাষ্ট্রের কাছে কাম্য নয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো এই ৩২ দিনের যুদ্ধকে এক মহা ভুলের সূচনা হিসেবে চিহ্নিত করবে যা কেবল একজনের দম্ভ এবং জেদের কারণে পুরো পৃথিবীর শান্তিকে বিসর্জন দিয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে এখন কেবল বারুদের গন্ধ আর অনিশ্চয়তার সুর এবং ট্রাম্পের নয়া কূটনীতি সেই আগুনেই ঘি ঢালছে যা নেভানোর শক্তি হয়তো অদূর ভবিষ্যতে আর কারো থাকবে না। তাই সময় থাকতেই শুভবুদ্ধির উদয় হওয়া প্রয়োজন এবং যুদ্ধের উন্মাদনা ছেড়ে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসাই হবে বিশ্ববাসীর জন্য একমাত্র মঙ্গলের পথ।
নতুবা এই যুদ্ধের দাবানল যখন ছড়িয়ে পড়বে তখন আরবদের টাকা বা ট্রাম্পের কূটনীতি কোনোটিই বিশ্বকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে না। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে যারা যুদ্ধের বিল অন্যের ওপর চাপাতে চেয়েছে তারা শেষ পর্যন্ত নিজেরাই ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে এবং ট্রাম্পের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হওয়ার কোনো কারণ আপাতত দৃশ্যমান নয়। বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে এক অনিশ্চিত ভোরের অপেক্ষায় যেখানে শান্তি ফেরানোর দায়িত্ব কেবল ওয়াশিংটনের নয় বরং প্রতিটি সচেতন বিশ্ব নাগরিকের এবং এই সত্যটি যত দ্রুত উপলব্ধি করা যাবে ততই মঙ্গল। নতুবা মধ্যপ্রাচ্যের এই অগ্নিগর্ভ শিখা একদিন আটলান্টিকের ওপারেও পৌঁছে যাবে যা রুখে দেওয়ার ক্ষমতা হয়তো তখন কারো থাকবে না। ট্রাম্পের এই মার্সেনারি কূটনীতি তাই কেবল একটি যুদ্ধের নাম নয় বরং এটি এক নতুন বিশ্ব বিপর্যয়ের পূর্বাভাস যা রুখে দেওয়াই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ভবিষ্যৎ পৃথিবীর শান্তিময় অস্তিত্ব নির্ভর করছে এই যুদ্ধের দ্রুত অবসানের ওপর এবং ট্রাম্পের এই অন্যায্য ও অযৌক্তিক ব্যয় চাপানোর নীতির কঠোর বিরোধিতার ওপর যা ইতিমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শুরু হয়েছে এবং এই জনমতই হয়তো শেষ পর্যন্ত এই উন্মাদনা থামানোর হাতিয়ার হয়ে উঠবে। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এখন এক মহাসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যেখানে ধ্বংস আর শান্তির মাঝখানে ব্যবধান কেবল একটি সঠিক সিদ্ধান্তের এবং সেই সিদ্ধান্তটি নেওয়ার দায়ভার এখন ট্রাম্প প্রশাসনের ওপরই বর্তায় যদি তারা সত্যিই বিশ্ব শান্তিতে বিশ্বাসী হয়ে থাকে। নতুবা মার্সেনারি কূটনীতির কলঙ্কতিলক নিয়েই তাদের বিদায় নিতে হবে বিশ্বমঞ্চ থেকে যা আমেরিকার দীর্ঘদিনের অর্জিত সম্মানকে ধুলোয় মিশিয়ে দেবে। ইরান যুদ্ধের এই ৩২তম দিনের শেষে আমাদের প্রার্থনা কেবল এটুকুই যেন পৃথিবীর কোনো দেশকেই অন্যের যুদ্ধের বিল নিজের রক্ত দিয়ে মেটাতে না হয়।
ট্রাম্পের নয়া এই কূটনীতি ইতিহাসের পাতায় কেবল একটি কালো অধ্যায় হিসেবেই বেঁচে থাকবে যা আমাদের মনে করিয়ে দেবে যে ক্ষমতার দম্ভ কীভাবে একটি অঞ্চলকে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করতে পারে। এখন সময় হয়েছে জেগে ওঠার এবং এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার যেন আগামীকালের সূর্য এক রক্তপাতহীন ও শান্তিময় পৃথিবীর বার্তা নিয়ে উদিত হয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের অগ্নিগর্ভ ভবিষ্যৎ যেন শান্তির এক নতুন দিগন্তে রূপান্তরিত হয়। এটিই হোক আমাদের সকলের কাম্য এবং এই লক্ষ্যেই যেন পরিচালিত হয় বিশ্ব রাজনীতির প্রতিটি পদক্ষেপ যাতে আর কোনো সাধারণ মানুষকে যুদ্ধের নিষ্ঠুর বলি হতে না হয় এবং কোনো দেশকে যেন অর্থনৈতিক শোষণের শিকার হতে না হয়। এই যুদ্ধের সমাপ্তিই কেবল মধ্যপ্রাচ্যকে রক্ষা করতে পারে নতুবা ধ্বংস অনিবার্য। ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না যদি আমরা আজ এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার না হই এবং ট্রাম্পের এই বিপজ্জনক খেলা বন্ধ করতে না পারি। পৃথিবী শান্তির জন্য তৃষ্ণার্ত এবং সেই তৃষ্ণা মেটানোর দায়িত্ব কেবল আমাদেরই। আসুন আমরা যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং শান্তির পক্ষে দাঁড়াই যেন আগামীর পৃথিবী হয় নিরাপদ এবং বৈষম্যহীন। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকটময় মুহূর্তে প্রতিটি সিদ্ধান্তই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ট্রাম্পের মার্সেনারি কূটনীতি সেই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের পথকেই কঠিন করে তুলছে যা থেকে উত্তরণ জরুরি। শেষ পর্যন্ত সত্য ও ন্যায়েরই জয় হোক এবং পৃথিবী যেন যুদ্ধের অভিশাপ থেকে মুক্তি পায় এটিই আমাদের শেষ কথা।

