রাজধানী ঢাকার রাজপথ ও ফুটপাত আজ কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়, বরং তা সাধারণ পথচারীদের জন্য এক রুদ্ধশ্বাস ও অবরুদ্ধ জনপদে পরিণত হয়েছে। নাগরিকের নিরাপদে পথ চলার যে আইনগত ও মৌলিক অধিকার, তা আজ হকার, অবৈধ দখলদার এবং নেপথ্যের প্রভাবশালী রাজনৈতিক চক্রের এক অশুভ ও শক্তিশালী আঁতাতে জিম্মি। ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ গত ১ এপ্রিল থেকে রাজধানীজুড়ে যে বিশেষ ‘চিরুনি অভিযান’ শুরু করেছে, তার পরিসংখ্যানগত সাফল্য প্রথম দৃষ্টিতে ঈর্ষণীয় মনে হতে পারে। দুই লাখ ৬১ হাজার টাকা জরিমানা, অর্ধশতাধিক ব্যক্তির কারাদণ্ড এবং কয়েক ট্রাক মালামাল জব্দ—প্রশাসনের এই কঠোরতা একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চাইলেও মাঠপর্যায়ের রূঢ় বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা।
উচ্ছেদ আর পুনর্দখলের এই যে সুদীর্ঘ ও ক্লান্তিকর ‘চোর-পুলিশ’ খেলা, তা কেবল প্রশাসনের সক্ষমতাকেই বিদ্রূপ করছে না, বরং জনমনে এক গভীর হতাশা ও আস্থার সংকট তৈরি করছে। রাজধানীর ফুলবাড়িয়া, গুলিস্তান, মতিঝিল, যাত্রাবাড়ী কিংবা মিরপুরের মতো ব্যস্ততম এলাকাগুলোর চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উচ্ছেদকারী দল প্রস্থান করার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই জাদুকরী ক্ষিপ্রতায় আবারও পূর্বাবস্থায় ফিরে যাচ্ছে ফুটপাত। এই যে চিরচেনা বিশৃঙ্খলা, এর মূলে রয়েছে এক শক্তিশালী ও সংবদ্ধ ‘চাঁদাবাজির অর্থনীতি’।
হকাররা কেবল পেটের তাগিদে বা নিরুপায় হয়ে রাস্তায় বসেন না; বরং প্রতিটি ইঞ্চি জায়গার জন্য তাদের প্রতিদিন গুণতে হয় মোটা অংকের চাঁদা। এই অর্থ কোনো রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয় না, বরং তা স্থানীয় প্রভাবশালী ‘লাইনম্যান’ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক পরিচয়ধারী বিভিন্ন স্তরের চক্রের পকেটে নিয়মিত পৌঁছে যায়। ফলে প্রশাসনের এই সাময়িক তৎপরতা বা অভিযান হকারদের কাছে কোনো স্থায়ী আতঙ্ক নয়, বরং একটি যৎসামান্য ‘পেশাগত ঝুঁকি’ বা সাময়িক বিরতি হিসেবেই গণ্য হয়। এই চক্রটি এতটাই শক্তিশালী যে, তারা আইনের শাসনের চেয়েও নিজেদের পেশীশক্তির দাপটকে বড় করে দেখে এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের সমান্তরালে একটি অদৃশ্য ‘ছায়া সরকার’ পরিচালনা করে।
ঢাকার ফুটপাত দখলমুক্ত করার পথে প্রধান অন্তরায় হলো এর নেপথ্যে থাকা বিশাল অংকের অবৈধ অর্থপ্রবাহ। বিভিন্ন সময়ে নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, রাজধানীর ফুটপাতগুলো থেকে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা চাঁদা আদায় হয়। এই টাকার ভাগবাটোয়ারা চলে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে, যেখানে প্রশাসনের একটি অসাধু অংশ এবং স্থানীয় প্রভাবশালীরা এই চক্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে কাজ করে। যখনই কোনো বড় অভিযান শুরু হয়, তখনই এই সিন্ডিকেট হকারদের ‘মানবিক’ ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে জনমতকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে।
অথচ প্রকৃত সত্য হলো, এই হকাররা নিজেরা খুবই সামান্য আয় করেন, সিংহভাগ অর্থ চলে যায় ওই প্রভাবশালী চক্রের পকেটে। এই সিন্ডিকেটকে উপড়ে না ফেলে কেবল হকার উচ্ছেদ করা মানে হলো কেবল লক্ষণ দেখে চিকিৎসা করা, রোগের মূল উৎপাটন করা নয়। যতক্ষণ না এই অর্থপ্রবাহের পথ স্থায়ীভাবে বন্ধ হচ্ছে, ততক্ষণ প্রতিটি উচ্ছেদ অভিযানই কেবল ‘রুটিন তামাশা’ হিসেবে ইতিহাসের পাতায় জমা হবে। এর পাশাপাশি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির বাগাড়ম্বর বছরের পর বছর শোনা গেলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন যৎসামান্য। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কঠোর নির্দেশনার পরও সিটি কর্পোরেশন ও পুলিশের মধ্যে একটি স্থায়ী ও সমন্বিত তদারকি কাঠামোর অনুপস্থিতি এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
উচ্ছেদের পর সেই জায়গাটি ধরে রাখার প্রাথমিক দায়িত্ব কার—এই প্রাতিষ্ঠানিক ঠেলাঠেলিতেই মূলত দখলদাররা পুনরায় বসার সুযোগ পায়। বিশেষ করে মেট্রোরেলের মতো আধুনিক ও ব্যয়বহুল অবকাঠামোর নিচের অংশ যখন পুনরায় জবরদখলে চলে যায়, তখন রাষ্ট্রের উন্নয়ন দর্শনের সঙ্গে এই অব্যবস্থাপনার বৈপরীত্য প্রকট হয়ে ধরা দেয়। মিরপুর থেকে মতিঝিল পর্যন্ত দীর্ঘ এই আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার নিচে যদি হকারদের পসরা আর ময়লা-আবর্জনার স্তূপ থাকে, তবে স্মার্ট সিটির ধারণা কেবল উপহাসেই পরিণত হয়।
সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর হকারদের ‘ভোটব্যাংক’ বা মিছিলের জনবল হিসেবে ব্যবহারের সংকীর্ণ স্বার্থ পরিহার করতে হবে। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে লোকসমাগম নিশ্চিত করতে অনেক সময় হকারদের ওপর নির্ভর করতে হয় স্থানীয় নেতাদের, আর বিনিময়ে তাদের ফুটপাত দখলের অলিখিত ‘লাইসেন্স’ দেওয়া হয়। এই যে পারস্পরিক স্বার্থের লেনদেন, এটিই ঢাকার ফুটপাতকে আজ নরকযন্ত্রণায় পরিণত করেছে। একটি আধুনিক মেগাসিটিতে ফুটপাত দিয়ে মানুষ হাঁটতে পারবে না—এটি কেবল অব্যবস্থাপনা নয়, বরং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নাগরিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন। অফিস ছুটির সময় নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের যে ভিড়ের মধ্যে হকারদের চকি আর ঝুড়ির ধাক্কা সামলে চলতে হয়, তা যে কোনো সভ্য সমাজের জন্য লজ্জাজনক।
পথচারীদের এই আর্তনাদ প্রশাসনের কানে পৌঁছালেও কেন স্থায়ী সমাধান আসে না, তার উত্তর লুকিয়ে আছে এই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগসাজশের গভীরে। যাত্রাবাড়ী মোড় থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত বিস্তৃত সড়কে ট্রাফিক ওয়ারী বিভাগের অভিযান কিংবা রমনা বিভাগের বঙ্গবাজার ও গোলাপশাহ মাজার এলাকায় পরিচালিত অভিযানগুলোর ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উচ্ছেদের পরপরই ভ্যানগাড়িগুলো আবারও সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। হকারদের দাবি, তারা টাকা দিয়ে বসেন, তাই তাদের কেউ না খেয়ে রাখবে না—এই মানসিকতা মূলত প্রশাসনের শিথিলতারই ফসল। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে অ্যাম্বুলেন্স চলাচলের পথ আগলে রাখা অবৈধ পার্কিং কিংবা গুলিস্তানের ফুটপাত ছাড়িয়ে মূল রাস্তার অর্ধেক দখল করে নেওয়া—এই দুঃসহ বাস্তবতায় নাগরিক জীবনের যবনিকা যেন কোনো এক অন্ধকার গহ্বরে আটকে আছে।
হকার সমস্যার সমাধান কেবল লাঠি বা জরিমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বিশ্বের অনেক বড় শহরেই হকার রয়েছে, কিন্তু তারা ফুটপাত দখল করে পথচারীদের চলাচল রুদ্ধ করে না। আমাদের এখানেও হকারদের জন্য সুনির্দিষ্ট ‘হলিডে মার্কেট’ বা নির্ধারিত জোন তৈরি করা সময়ের দাবি। সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে বা নির্দিষ্ট সময়ে তারা নির্দিষ্ট স্থানে বসবেন এবং এর বাইরে কোনোভাবেই মূল রাস্তা বা ফুটপাত দখল করা যাবে না। একই সঙ্গে, যারা ফুটপাত দখল করে বড় বড় শোরুমের মালামাল সাজিয়ে রাখেন, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর হওয়া প্রয়োজন।
রাজধানীর বাংলামোটর এলাকায় বাইক ও গাড়ি মেরামতের দোকানগুলো পুরো ফুটপাত ও রাস্তার একটি লেন দখল করে কাজ করে, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে অভিযানের তীব্রতা হকারদের তুলনায় সবসময়ই কম দেখা যায়। আইন কেবল ক্ষুদ্র হকারদের জন্য নয়, বড় প্রভাবশালীদের জন্যও সমানভাবে কার্যকর হতে হবে। সিটি কর্পোরেশনের সম্পত্তি বিভাগ থেকে আধুনিক ক্রেন ব্যবহার করে জব্দকৃত মালামাল নিলামে তোলার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা প্রশংসনীয় হলেও এর ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা জরুরি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর সমন্বয়হীনতার অজুহাতে রাজপথের অরাজকতাকে প্রশ্রয় দেওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে বারবার কড়া নির্দেশনা দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়ন কেন হচ্ছে না, সেটি তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। কেবল বিশেষ দিবস বা সপ্তাহজুড়ে অভিযান চালালে রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থার কোনো স্থায়ী উন্নতি হবে না। সিসিটিভি ক্যামেরা বা ‘স্মার্ট সিটি’ প্রকল্পের প্রযুক্তিগত দোহাই দিয়ে সময়ক্ষেপণ করার চেয়ে প্রয়োজন মাঠপর্যায়ের সততা এবং অপরাধীদের প্রতি জিরো টলারেন্স নীতি।
চলমান এই বিশেষ অভিযান ৫ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু নগরবাসীর মনে শঙ্কা রয়ে গেছে পরবর্তী দিনগুলো নিয়ে। ৫ এপ্রিলের সূর্যোদয় কি সত্যিই একটি পরিচ্ছন্ন ঢাকার বার্তা নিয়ে আসবে, নাকি আবারও সেই পুরনো বিশৃঙ্খলার অতল গহ্বরে তলিয়ে যাবে রাজধানী? আড়াই লাখ টাকা জরিমানা আর ৫১ জনের কারাদণ্ড কি কেবলই নথিপত্রের পরিসংখ্যান বাড়িয়ে প্রশাসনের দায়মুক্তির পথ প্রশস্ত করবে, নাকি রাজপথে কোনো দৃশ্যমান ও স্থায়ী পরিবর্তন আনবে? ঢাকার ফুটপাত কোনো গোষ্ঠী বা সিন্ডিকেটের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি জনগণের করের টাকায় নির্মিত রাষ্ট্রের সম্পদ। এই সম্পদ উদ্ধার ও রক্ষণাবেক্ষণ করা প্রশাসনের কোনো করুণা নয়, বরং তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব।
সমাধান কেবল উচ্ছেদ নয়, বরং হকারদের সুশৃঙ্খল পুনর্বাসন এবং যারা তাদের নেপথ্য থেকে মদদ দিচ্ছে, সেই রাঘববোয়ালদের নাম জনসম্মুখে প্রকাশ করে বিচারের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। প্রশাসনের কলমের ডগায় আর পুলিশের সদিচ্ছায় যদি এই যবনিকা টানা না যায়, তবে এই শহরটি অচিরেই বাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। ঢাকার দুই কোটি মানুষের প্রাণের দাবি-ফুটপাত হোক অবাধ এবং চলাচল হোক নিরাপদ। প্রতিটি নাগরিকের নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব, আর সেই দায়িত্ব পালনে কোনো শিথিলতা কাম্য নয়। এবারের অভিযান যেন সত্যিই উদাহরণ হয়ে থাকে, এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে রাজপথ যেন সাধারণ মানুষের কাছে ফিরে আসে, এটাই হোক আগামী দিনের প্রধান প্রত্যাশা।
প্রশাসনের কঠোর মনোভাব যদি শেষ পর্যন্ত বজায় থাকে এবং সিটি কর্পোরেশন ও পুলিশ সমন্বিতভাবে কাজ করে, তবেই সম্ভব এই ফুটপাত দখলের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়া। ঢাকার রাজপথ আজ মুক্তির গান গাইছে, সেই গানে সুর মেলাক প্রশাসন ও জনগণ একসাথে। তবেই সার্থকতা পাবে আড়াই লাখ টাকা জরিমানা আর ৫১ জনের কারাদণ্ড। অন্যথায় সব হবে পণ্ডশ্রম। রাজধানী ঢাকা ফিরুক তার চিরচেনা রূপে, যেখানে মানুষ হাঁটবে নিরাপদে, নির্ভয়ে। এটাই হোক আগামীর অঙ্গীকার। সুশাসনের জয় হোক সর্বত্র এবং ঢাকার ফুটপাত ফিরে পাক তার প্রকৃত সত্তা। যবনিকা টানা হোক উচ্ছেদ-পুনর্দখলের এই অন্তহীন তামাশার। জনগণের বিজয় হোক সুনিশ্চিত। রাজপথ ও ফুটপাত দখলমুক্ত করা মানেই যানজট অর্ধেক কমিয়ে আনা, আর এই সত্যটি প্রশাসন যত দ্রুত উপলব্ধি করবে, ততই নগরবাসীর মঙ্গল।

