তীব্র গরম ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের প্রভাবে দেশজুড়ে হাতে তৈরি তালপাখার চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এই বাড়তি চাহিদার বড় একটি অংশ পূরণ করছে নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার জামনগর ইউনিয়নের হাঁপানিয়া ফকিরপাড়া গ্রাম। তবে চাহিদা এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, উৎপাদন করতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে পাখা—ফলে চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন স্থানীয় কারিগররা।
নাটোর শহর থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হাঁপানিয়া গ্রামটি তালগাছবিহীন হলেও ‘তালপাখার গ্রাম’ হিসেবে সুপরিচিত। গ্রামের প্রায় শতাধিক পরিবার এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত, যেখানে নারীরাই প্রধান ভূমিকা পালন করছেন। বছরের প্রায় ছয় মাস গৃহস্থালির কাজের পাশাপাশি তালপাখা তৈরি করে তারা পরিবারের জন্য বাড়তি আয়ের উৎস তৈরি করেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, গ্রামের প্রতিটি বাড়িই যেন ক্ষুদ্র কারখানায় পরিণত হয়েছে। কোথাও তালপাতা কাটা, কোথাও শুকানো, আবার কোথাও রঙিন খিল বসিয়ে পাখা তৈরির কাজ চলছে। নারী-পুরুষ সবাই মিলে দিন-রাত কাজ করেও বাজারের চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না। অনেক ক্ষেত্রেই পাখা তৈরি হওয়ার আগেই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।
কারিগরদের মতে, তালপাখা তৈরির প্রধান কাঁচামাল তালপাতা ও ডাগুর, যা প্রতি বছর পৌষ মাসের শুরুতে নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা থেকে সংগ্রহ করা হয়। প্রতিটি তালপাতার দাম পড়ে ২৫ থেকে ৩০ টাকা। এগুলো নির্দিষ্ট মাপে কেটে কয়েকদিন রোদে শুকানোর পর বাঁশের কাঠি দিয়ে প্রসারিত করে রঙিন খিল ও সেলাইয়ের মাধ্যমে চূড়ান্ত পণ্য তৈরি করা হয়।
একটি তালপাখা তৈরি করতে কাঁচামালসহ মোট খরচ পড়ে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। কারিগররা পাইকারদের কাছে তা বিক্রি করেন ৪০ থেকে ৪৫ টাকায়, আর খুচরা বাজারে এর দাম ৫০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত।
কারিগররা জানান, গত বছর চাহিদা কম থাকায় কাঁচামালও কম সংগ্রহ করা হয়েছিল। কিন্তু চলতি মৌসুমে তীব্র গরম ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে চাহিদা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে গেছে। ফলে কাঁচামাল সংকটের পাশাপাশি উৎপাদন বাড়ানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
গ্রামের প্রবীণ কারিগর সাবেজান বেগম বলেন, বিয়ের পর থেকেই তিনি এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। তালপাখা তৈরি করেই সন্তানদের লালন-পালন ও বিয়ে দিয়েছেন। বর্তমানে চাহিদা অনেক বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে পাখাশিল্পী আলাউদ্দিন জানান, গতবার কম চাহিদার কারণে কাঁচামাল কম আনা হয়েছিল। কিন্তু এবার চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় দিন-রাত কাজ করেও বাজারের প্রয়োজন মেটানো যাচ্ছে না।
প্রধানত ঢাকা, টাঙ্গাইল, খুলনা, পাবনা ও সিরাজগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই গ্রামের তালপাখা সরবরাহ করা হয়। তবে বর্তমানে অতিরিক্ত চাহিদার কারণে অনেক পাইকার সময়মতো পণ্য পাচ্ছেন না।
এদিকে শ্রমের তুলনায় মজুরি কম হওয়ায় কারিগররা কাঙ্ক্ষিত লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। জানা গেছে, ১০০ পিস পাখা তৈরি করে মজুরি পাওয়া যায় মাত্র ৮০০ টাকা। ৪ থেকে ৬ জন নারী একসঙ্গে কাজ করলে দিনে প্রায় ২০০ পিস পাখা তৈরি করা সম্ভব হলেও কাঁচামাল সংকট ও চাহিদার চাপ উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে।
জামনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম রাব্বানী বলেন, তালপাখা শিল্প এই অঞ্চলের একটি সম্ভাবনাময় খাত। তবে প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধার অভাবে কারিগররা পিছিয়ে রয়েছেন। সরকারি সহায়তা পাওয়া গেলে এই শিল্প আরও প্রসারিত হবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সংক্ষিপ্ত সংস্করণ (১০০–১২০ শব্দ): তীব্র গরম ও লোডশেডিংয়ের কারণে দেশে হাতে তৈরি তালপাখার চাহিদা বেড়েছে, যার বড় অংশ সরবরাহ করছে নাটোরের হাঁপানিয়া গ্রাম। শতাধিক পরিবার, বিশেষ করে নারীরা, এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থেকে ছয় মাস ধরে পাখা তৈরি করে আয় করছেন। বর্তমানে চাহিদা এত বেশি যে উৎপাদনের আগেই পাখা বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। কাঁচামাল সংকট ও সীমিত মজুরির কারণে কারিগররা চাপে

