টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে পার্বত্য জেলা বান্দরবানে ভয়াবহ দুর্যোগ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বন্যা, পাহাড়ধসের আশঙ্কা, সড়ক যোগাযোগে বিঘ্ন এবং দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় জেলার জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। প্রবল পাহাড়ি ঢলের স্রোতে ভেসে আলিয়া সোলতানা নামে পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে থানচির দুর্গম নাফাখুম জলপ্রপাতে ৭৮ জন পর্যটক ও ৯ জন গাইডসহ মোট ৮৭ জন আটকা পড়েছেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, অব্যাহত ভারী বর্ষণে থানচি উপজেলার সাঙ্গু নদীর পানি বিপজ্জনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলা সদর থেকে তিন্দু ও রেমাক্রী ইউনিয়নের নৌযোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এর ফলে নাফাখুম এলাকায় অবস্থানরত পর্যটক ও গাইডরা আটকা পড়েন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জননিরাপত্তার স্বার্থে আগামী ১০ জুলাই পর্যন্ত জেলার সব পর্যটন কেন্দ্র, ঝর্ণা, পাহাড়ি ট্রেইল, নদীপথ এবং দুর্গম এলাকায় ভ্রমণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন।
সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে সীমান্তবর্তী নাইক্ষ্যংছড়িতে। সেখানে পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে ভেসে পাঁচ বছর বয়সী আলিয়া সোলতানার মৃত্যু হয়।
এদিকে লামা ও আলীকদম উপজেলায় পাহাড়ি ঢল এবং মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। আলীকদমের প্রধান সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। এছাড়া ফাইতং ইউনিয়নে পাহাড়ধসে একটি বসতবাড়ির অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতে বান্দরবান জেলা সদরের কালাঘাটা, বালাঘাটা, বনরূপা পাড়া ও সিদ্দিক নগরসহ বিভিন্ন এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। নিচু এলাকার বহু পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়ায় প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের উদ্যোগে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার জন্য জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে।
ভারী বর্ষণে মাটি নরম হয়ে বান্দরবান-কেরানীহাট সড়কের গ্রীনপিক রিসোর্ট সংলগ্ন এলাকায় ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের একটি খুঁটি হেলে পড়ে। এর ফলে বান্দরবান সদর, রোয়াংছড়ি, রুমা ও থানচি উপজেলায় টানা প্রায় ১৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকে। এতে হাসপাতাল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, মোবাইল নেটওয়ার্ক এবং ইন্টারনেট সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে প্রায় ১৫ ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরায় স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়েছে।
বান্দরবানের জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস জানান, পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলার সাতটি উপজেলায় ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে সড়কের ওপর মাটি ও পাথর ধসে পড়ায় যান চলাচল ব্যাহত হলেও ফায়ার সার্ভিস, সিভিল ডিফেন্স ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় সড়ক সচল রাখতে প্রশাসন নিরলসভাবে কাজ করছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ভ্রমণ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

