ঢাকার মিরপুরে শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সোহেল বর্তমানে গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের একটি কনডেম সেলে রয়েছেন। আলোচিত এ মামলার আসামি হওয়ায় তার নিরাপত্তা ও মানসিক অবস্থার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাকে বিশেষ পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ।
কারা সূত্র জানায়, কাশিমপুরে আনার পর সোহেল অনেকটা নিশ্চুপ হয়ে পড়েন। কারারক্ষী বা অন্য কেউ কথা বললেও অধিকাংশ সময় তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাতেন না। পাশাপাশি তার দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডও ছিল সীমিত। বর্তমানে নির্ধারিত সময়ে কনডেম সেলের করিডোরে হাঁটার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে তাকে।
কারা-সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, কারাগারে আসার পর প্রথমদিকে সোহেল মাদকাসক্তি ও মানসিক অস্থিরতায় ভুগছিলেন এবং তার আচরণও ছিল অস্বাভাবিক। তবে সময়ের সঙ্গে তার অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে দাবি কারা কর্তৃপক্ষের। বর্তমানে তিনি নিয়মিত নামাজ পড়ছেন এবং আরবি শেখার চেষ্টা করছেন।
সোহেলের অনুরোধের পর কারা কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে কারাগারে থাকা একজনের মাধ্যমে তাকে আরবি শেখার ব্যবস্থা করা হয়। ধর্মীয় ও শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার মাধ্যমে তিনি বর্তমানে সময় কাটাচ্ছেন।
কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি হিসেবে সোহেলকে কাশিমপুরে স্থানান্তর করা হয়। মামলাটি দেশজুড়ে আলোচিত হওয়ায় তার নিরাপত্তার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে অন্য বন্দিদের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাকে আলাদা কনডেম সেলে রাখা হয়েছে।
তিনি জানান, সোহেলের অনুরোধে তাকে আরবি শেখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তিনি নামাজ পড়াও শিখেছেন। সম্প্রতি তার নিকটাত্মীয়রা এবং তার শিশু সন্তান কারাগারে এসে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ফারুক আহমেদ জানান, গ্রেপ্তারের পর আদালতের মাধ্যমে সোহেলকে প্রায় দেড় মাস ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে নিয়ম অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল দায়েরের পর তাকে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। সেখানে তাকে বিশেষ নিরাপত্তার মধ্যেই রাখা হয়েছে।
কারা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের দীর্ঘদিনের একাকিত্ব, অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপ থেকে বিষণ্নতা এবং আত্মহানির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ কারণে তাদের ওপর নিয়মিত নজরদারি করা হয়। ধর্মীয় ও শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা অনেক ক্ষেত্রে বন্দিদের মানসিক স্থিতি বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে বলেও মনে করেন তারা।
এদিকে একই মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তার বর্তমানে কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন।
মামলার নথি অনুযায়ী, গত ১৯ মে মিরপুরের পল্লবীর একটি ফ্ল্যাট থেকে শিশু রামিসার খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর আগে ওই ফ্ল্যাটের বাসিন্দা সোহেল শৌচাগারের গ্রিল ভেঙে পালিয়ে যান। ঘটনাস্থল থেকে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে আটক করা হয়। পরে একই দিন সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে সোহেলকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় শিশুটির বাবা পল্লবী থানায় হত্যা মামলা করেন।
ঘটনার ১৯ দিনের মাথায়, গত ৭ জুন আদালত শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দেন। আদালতের রায়ে বলা হয়, চিকিৎসকের সাক্ষ্য, তদন্ত কর্মকর্তার প্রতিবেদন, আসামির জবানবন্দি এবং অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণে সোহেলের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। অপরাধে সহযোগিতার দায়ে তার স্ত্রী স্বপ্নাকেও একই দণ্ড দেওয়া হয়।
বর্তমানে মামলার মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন (ডেথ রেফারেন্স) এবং আসামিদের জেল আপিল শুনানির জন্য পেপারবুক প্রস্তুত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নথি হাইকোর্টে পৌঁছেছে এবং নির্ধারিত বেঞ্চে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

