ফরিদপুরের সালথা উপজেলার আটঘর গ্রামের সোহেল ও ঝর্ণা দম্পতির দীর্ঘদিনের মানবেতর জীবনে স্বস্তির আশার আলো জ্বালিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। অন্যের গরুর গোয়ালঘরকে বসতঘর হিসেবে ব্যবহার করে স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে বসবাস করা এই পরিবারের জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে নতুন বসতঘর ও দোকান। পাশাপাশি দোকানের মালামালেরও ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টায় আটঘর গ্রামে সোহেল-ঝর্ণা দম্পতির ঘর ও দোকান নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দবির উদ্দিন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলাম, আটঘর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাহিদুর রহমান খান, সালথা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম, আটঘর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রাজিয়া বেগম ও জয়নাল মুন্সীসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্থানীয় ওহাব মাতুব্বরের গরু রাখার জন্য নির্মিত ছোট্ট একটি ঘরই ছিল সোহেল-ঝর্ণা দম্পতির পরিবারের একমাত্র আশ্রয়। স্যাঁতসেঁতে ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে দুই সন্তানকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সেখানেই বসবাস করছিলেন তারা। ঘরটি এতটাই ছোট ছিল যে, স্বাভাবিক জীবনযাপন করাও তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল।
শারীরিক অসুস্থতার কারণে সোহেল নিয়মিত কাজ করতে পারেন না। তার স্ত্রী ঝর্ণাও দীর্ঘদিন ধরে দুই কিডনি নষ্ট হয়ে অসুস্থ। একসময় ভিক্ষা করে সংসারে সামান্য সহযোগিতা করলেও শারীরিক অসুস্থতার কারণে এখন সেটিও করতে পারেন না তিনি। ফলে খাবার, চিকিৎসা ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছিল পরিবারটির।
দারিদ্র্যের প্রভাব পড়েছে সন্তানদের পড়াশোনাতেও। ১৩ বছর বয়সী বড় ছেলে পরিবারের অভাবের কারণে স্কুল ছেড়ে স্থানীয় একটি দোকানে কাজ করছে। যে বয়সে তার হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, সেই বয়সেই সংসারের দায়িত্বের বোঝা কাঁধে নিতে হয়েছে তাকে। তবে সাত বছর বয়সী ছোট ছেলে বর্তমানে প্রথম শ্রেণিতে পড়ছে।
পরিবারটির দুরবস্থার খবর পেয়ে গত শুক্রবার বিকেলে তাদের বাড়িতে যান ইউএনও দবির উদ্দিন। সরেজমিনে পরিবারের বাস্তব অবস্থা দেখে তিনি তাদের জন্য একটি বসতঘর নির্মাণের উদ্যোগ নেন। একই সঙ্গে পরিবারের স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা করতে একটি দোকান নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ইউএনও দবির উদ্দিন বলেন, “পরিবারটির অবস্থা অত্যন্ত মানবেতর। তাদের মাথা গোঁজার মতো কোনো ঘর নেই, পাশাপাশি স্থায়ী আয়েরও ব্যবস্থা নেই। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘর ও দোকান নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। দোকানের মালামালেরও ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, স্থায়ী আশ্রয় ও আয়ের ব্যবস্থা হলে পরিবারটির জীবনযাত্রায় কিছুটা স্বস্তি ফিরবে। তারা নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে পারবেন—এটাই তাদের প্রত্যাশা।
স্থানীয় ইউপি সদস্য রাজিয়া বেগম বলেন, পরিবারটির জন্য সবার আগে একটি নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজন ছিল। প্রশাসনের উদ্যোগে ঘর নির্মাণ শুরু হওয়ায় অন্তত নিরাপদে থাকার একটি ঠিকানা পাবে পরিবারটি।
স্থানীয় বাসিন্দা রবিউল মাতুব্বর বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পরিবারটির দুরবস্থা দেখে আসছেন তারা। সোহেল ও তার স্ত্রীর চিকিৎসার পাশাপাশি একটি ঘর ও আয়ের ব্যবস্থা প্রয়োজন ছিল। প্রশাসনের উদ্যোগে তাদের কষ্ট অনেকটাই কমবে বলে আশা করেন তিনি।
সালথা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, সোহেল-ঝর্ণা দম্পতির মানবেতর জীবনযাপন সত্যিই দুঃখজনক। দীর্ঘদিন তারা অন্যের গরুর গোয়ালঘরে বসবাস করেছেন। উপজেলা প্রশাসন তাদের ঘর নির্মাণের পাশাপাশি জীবিকার ব্যবস্থাও করছে, যা প্রশংসনীয় উদ্যোগ। সমাজের বিত্তবান ও সামর্থ্যবান মানুষদেরও এমন অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়ানো উচিত।
স্থানীয়দের আশা, ঘর ও দোকান নির্মাণ শেষ হলে সোহেল-ঝর্ণা দম্পতির জীবনে স্বস্তি ফিরবে। নিরাপদ আশ্রয়ের পাশাপাশি আয়ের পথ তৈরি হলে সন্তানদের পড়াশোনাও চালিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা পেরিয়ে পরিবারটি এবার নতুন করে স্বপ্ন দেখার সুযোগ পাবে।

