ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ফজলুল হক মুসলিম হলে চোর সন্দেহে মানসিক ভারসাম্যহীন যুবক তোফাজ্জল হোসেনকে প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে মারধর করা হয়েছিল। চড়-থাপ্পড়, কিল-ঘুষির পাশাপাশি স্টাম্প দিয়ে পেটানো এবং কাঁচি দিয়ে চুল কেটে দেওয়ার অভিযোগও উঠে এসেছে। পরে আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বরের ওই ঘটনার প্রায় ৯০ ঘণ্টার ৬৪টি ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ভিডিও ফুটেজের পাশাপাশি আসামিদের জবানবন্দি, সাক্ষীদের বক্তব্য ও অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করে পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা হান্নানুল ইসলাম গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর ২৮ জনকে আসামি করে আদালতে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেন।
অভিযোগপত্রে সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিট থেকে রাত ১০টা ৩৩ মিনিট পর্যন্ত তোফাজ্জলকে মারধর ও জিজ্ঞাসাবাদের বিভিন্ন ঘটনার বিবরণ রয়েছে।
পিবিআইয়ের তদন্ত অনুযায়ী, ঘটনার দিন ফজলুল হক মুসলিম হলের মাঠে একটি টুর্নামেন্ট চলছিল। দুপুরে সেখান থেকে ছয়টি মুঠোফোন চুরি হয়। সন্ধ্যায় খেলা চলার সময় তোফাজ্জলকে দেখে কয়েকজন শিক্ষার্থী তাকে ওই চুরির সঙ্গে জড়িত বলে সন্দেহ করেন।
সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিটের দিকে তোফাজ্জলকে ধরে মারধর শুরু করা হয়। দুই মিনিট পর তাকে হলের মূল ভবনের গেস্টরুমে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বিভিন্ন সময়ে ৭০ থেকে ৮০ জন শিক্ষার্থী অবস্থান করছিলেন।
রাত ৮টা ১১ মিনিটের দিকে শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারেন, দুপুরে চুরি হওয়া ছয়টি ফোনের চোরের সঙ্গে তোফাজ্জালের চেহারার মিল নেই। এরপরও তার কাছে ফোন উদ্ধারের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলতে থাকে।
পিবিআইয়ের অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, তোফাজ্জল ফোনগুলো চুরি করেছেন বলে স্বীকার করেছিলেন এবং সেগুলো কোথায় বা কার কাছে পাওয়া যেতে পারে, সে বিষয়ে কয়েকটি মুঠোফোন নম্বর দেন। শিক্ষার্থীরা ওই নম্বরগুলোতে যোগাযোগ করেও ফোন উদ্ধার করতে পারেননি।
একপর্যায়ে ক্ষুধার কথা জানালে রাত ৮টা ৩৬ মিনিটের দিকে তোফাজ্জলকে হলের ক্যানটিনে নেওয়া হয়। সেখানে প্রায় ১৪ মিনিট তাকে খাবার খাওয়ানো হয় এবং ওই সময় তাকে মারধর করা হয়নি বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
খাওয়া শেষে রাত ৮টা ৫২ মিনিটের দিকে ১২ থেকে ১৩ জন শিক্ষার্থী তোফাজ্জলকে হলের দক্ষিণ ভবনের গেস্টরুমে নিয়ে যান। এরপর বিভিন্ন সময়ে আরও ৫০ থেকে ৬০ জন শিক্ষার্থী সেখানে প্রবেশ ও বের হন।
তোফাজ্জলকে মারধরের খবর পেয়ে হলের শিক্ষক প্রতিনিধিরা সেখানে যান। তারা তাকে প্রক্টরিয়াল টিমের গাড়িতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে প্রথম দফায় তা সফল হয়নি। রাত ৯টা ৪৩ মিনিটে প্রক্টরিয়াল টিমের গাড়ি সেখান থেকে চলে যায়।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, এরপরও তোফাজ্জলকে মারধর করা হয়। রাত ১০টা ১৫ মিনিট থেকে ১০টা ৩৩ মিনিট পর্যন্ত কয়েকজন তাকে মারধর করেন। পরে রাত ১০টা ৩৩ মিনিটের দিকে প্রক্টরিয়াল টিমের গাড়ি আবার হলে আসে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যস্থতায় রাত ১০টা ৫২ মিনিটে তোফাজ্জলকে গাড়িতে তোলা হয়।
আনুমানিক রাত ১০টা ৫৭ মিনিটে তাকে ফজলুল হক মুসলিম হল থেকে প্রথমে শাহবাগ থানায় নেওয়া হয়। পরে থানার পরামর্শে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
আসামিদের জবানবন্দিতে নির্যাতনের বিবরণ
মামলার প্রাথমিক তদন্তে শাহবাগ থানার তদন্ত কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম ছয় আসামির আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দি পর্যালোচনা করেন। এসব জবানবন্দিতে তোফাজ্জলের ওপর মারধরের বিভিন্ন বিবরণ উঠে আসে।
আসামি ওয়াজিবুল তার জবানবন্দিতে বলেন, তোফাজ্জলকে প্রথমে চোর সন্দেহে চড়-থাপ্পড় দেওয়া হয়। পরে তাকে হলের গেস্টরুমে নিয়ে কয়েকজন লাঠি দিয়ে মারধর করেন। ওয়াজিবুল নিজেও তাকে চড়-থাপ্পড় দেওয়ার কথা স্বীকার করেন।
আরেক আসামি মোত্তাকিন জানান, ক্যানটিনে খাওয়ানোর পর তোফাজ্জলকে এক্সটেনশন ভবনের গেস্টরুমে নেওয়া হয়। সেখানে কয়েকজন তাকে কিল-ঘুষি ও স্টাম্প দিয়ে মারধর করেন। নিজের মুঠোফোন চুরি যাওয়ার ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে তিনিও তোফাজ্জালের পিঠে স্টাম্প দিয়ে আঘাত করেছিলেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন।
আসামি আহসান উল্লাহ জানান, রাত ১০টার পর হলে ফিরে গেস্টরুমের সামনে জটলা দেখতে পান। সেখানে ‘মোবাইল চোর’ আটক হয়েছে জানতে পেরে ভেতরে গিয়ে পাশে থাকা একটি স্টাম্প দিয়ে তোফাজ্জালের হাঁটুতে আঘাত করেন বলে তিনি জবানবন্দিতে জানান।
আসামি জালাল ও সাজ্জাদ তাদের জবানবন্দিতে তোফাজ্জালের হাতের ওপর স্টাম্প রেখে দুই প্রান্তে পা দিয়ে চাপ দিয়ে রাখার কথাও উল্লেখ করেন।
সুমন মিয়া নামের আরেক আসামি জানান, গেস্টরুমে তোফাজ্জালকে চড়-থাপ্পড় ও কিল-ঘুষি মারতে দেখেছেন। পরে ক্যানটিনে খাওয়ানোর পর তাকে এক্সটেনশন ভবনের গেস্টরুমে নেওয়া হলে কয়েকজন স্টাম্প দিয়ে মারধর করেন।
২৮ আসামি, বিচার এখনো শুরু হয়নি
তোফাজ্জালের মৃত্যুর ঘটনায় ১৯ সেপ্টেম্বর শাহবাগ থানায় মামলা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট অফিসের সুপারভাইজার মোহাম্মদ আমানুল্লাহ। এর ১০ দিন পর নিহতের ফুফাতো বোন আসমা তানিয়াও ঢাকার আদালতে মামলা করেন। আদালতের আদেশে দ্বিতীয় মামলাটি মূল মামলার সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
প্রথমে মামলাটির তদন্ত করেন শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক আমিনুল ইসলাম। তিনি বদলি হলে তদন্তের দায়িত্ব পান এসআই আসাদুজ্জামান। তদন্ত শেষে ২১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। বাদীপক্ষ ওই অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে নারাজি দিলে আদালত অধিকতর তদন্তের জন্য মামলাটি পিবিআইকে দেয়।
পরে পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা হান্নানুল ইসলাম প্রায় সাত মাস বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তদন্ত শেষ করেন। আগের অভিযোগপত্রে থাকা আসামিদের পাশাপাশি আরও কয়েকজনের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়ে শেষ পর্যন্ত ২৮ জনকে আসামি করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।
পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা হান্নানুল ইসলাম বলেন, আগের তদন্ত কর্মকর্তা ২১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছিলেন। গ্রেপ্তার ছয় আসামির জবানবন্দিতে যাদের নাম এসেছে, হাইকোর্টের নির্দেশনার কারণে তাদের বাদ দেওয়া সম্ভব হয়নি।
বর্তমানে ২৮ আসামির মধ্যে দুজন কারাগারে, নয়জন জামিনে রয়েছেন। বাকি ১৭ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলেও তারা এখনো গ্রেপ্তার হননি।
ঘটনার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও মামলাটির বিচার এখনো শুরু হয়নি। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিহত তোফাজ্জালের পরিবার।
তোফাজ্জালের ফুফাতো বোন আসমা তানিয়া বলেন, ‘দুই বছর হয়ে গেল, এখনো কেন বিচার শুরু হচ্ছে না, জানি না। এভাবে চললে কীভাবে বিচার শেষ হবে?’ তিনি দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান।

