দেশজুড়ে গ্যাস সংকটের প্রভাবে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সিএনজি অটোরিকশা, ব্যক্তিগত গাড়ি ও অন্যান্য গ্যাসচালিত যানবাহনের চালকরা। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকার সিএনজি ফিলিং স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও প্রয়োজনীয় গ্যাস মিলছে না। কোথাও আবার দীর্ঘ সময় গ্যাস বিক্রি বন্ধ থাকায় স্টেশনগুলোর সামনে তৈরি হচ্ছে যানবাহনের দীর্ঘ সারি।
এ পরিস্থিতিতে অনিয়ম ও অতিরিক্ত অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। সিএনজি অটোরিকশাচালক নুরুল ইসলাম জানান, দুই থেকে তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও গ্যাস না পাওয়ায় অফিসের সময় রক্ষার জন্য বাধ্য হয়ে এক পাম্পকর্মীকে ১০০ টাকা দিয়ে লাইনের সামনে যাওয়ার সুযোগ নেন। পরে মাত্র ১২০ টাকার গ্যাস নিতে পেরেছেন তিনি।
চলমান সংকটের সূত্রপাত গত ১৮ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর। টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সিএনজি স্টেশনগুলোতে।
রাজধানীর মহাখালী, তেজগাঁও, মিরপুর, খিলক্ষেত, যাত্রাবাড়ী ও উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকার স্টেশনে রাত থেকেই যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লে সীমিতসংখ্যক গাড়িতে গ্যাস দেওয়া হলেও চাপ কমে গেলে বিক্রি বন্ধ রাখতে হচ্ছে। অনেক চালক তিন থেকে চার ঘণ্টা অপেক্ষা করেও চাহিদামতো গ্যাস নিতে পারছেন না।
চট্টগ্রাম নগরীতেও পরিস্থিতি ভয়াবহ। পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় অনেক ফিলিং স্টেশন বন্ধ রয়েছে। হালিশহর, কদমতলী, আন্দরকিল্লা, জামালখান, বাকলিয়া, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, অক্সিজেন ও মইজ্জারটেকসহ বিভিন্ন এলাকায় স্টেশনের সামনে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। সিএনজি ও গণপরিবহনের সংখ্যা কমে যাওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা।
ময়মনসিংহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলাতেও একই পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। স্বল্পচাপের কারণে অনেক স্টেশন স্বাভাবিকভাবে গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না। এতে পরিবহন খাতের পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আফতাবনগরের বাসিন্দা ও একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী ইসরাত আমিন বলেন, সাধারণ সময়ে আফতাবনগর থেকে মতিঝিল যেতে সিএনজি অটোরিকশায় ২২০ থেকে ২৫০ টাকা ভাড়া লাগে। কিন্তু কয়েকদিন ধরে ৩৫০ টাকার নিচে কোনো চালক যেতে চাইছেন না। চালকদের ভাষ্য, গ্যাসের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে এবং পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় অতিরিক্ত ভাড়া নিতে হচ্ছে।
মহাখালীর জামান সিএনজি ফিলিং স্টেশনের কর্মী ইকবাল হোসেন বলেন, প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক নেই। স্টেশন খোলা থাকলেও অনেক সময় পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে এবং বিক্রিও কমে গেছে।
মিরপুরের শেওড়াপাড়ার একটি সিএনজি স্টেশনের কর্মী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, কম চাপের কারণে একটি গাড়িতে গ্যাস দিতে আগের তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই স্টেশনের সামনে দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে।
অটোরিকশাচালক শাহীন মিয়া বলেন, দিনের বড় একটি অংশ এখন গ্যাসের লাইনে দাঁড়িয়ে কাটছে। আগে যতগুলো ট্রিপ দেওয়া সম্ভব হতো, এখন তার অর্ধেকও দেওয়া যাচ্ছে না। এতে আয় কমে গেছে। একই সঙ্গে মালিকের দৈনিক জমা পরিশোধ করতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়ে ভাড়া বাড়াতে হচ্ছে।
সাতরাস্তার একটি সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষারত চালক বিপ্লব সরকার বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত পাম্প বন্ধ থাকে। তিনি রাত ৮টার দিকে লাইনে দাঁড়ালেও রাত ১২টা ১০ মিনিট পর্যন্ত গ্যাস পাননি। সরেজমিনে ওই সময় স্টেশনটির যানবাহনের সারি সাতরাস্তা ছাড়িয়ে কারওয়ান বাজার রেললাইনের দিক পর্যন্ত পৌঁছে যায়। দীর্ঘ সারির কারণে আশপাশের সড়কেও যানজট তৈরি হয়।
বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফারহান নূর বলেন, গ্যাস সংকট এখন শুধু রাজধানীতে সীমাবদ্ধ নেই; সারা দেশেই এর প্রভাব পড়েছে। বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন স্বল্পচাপের অভিযোগ আসছে। অনেক স্টেশন মাত্র ২ থেকে ৩ পিএসআই চাপ পাচ্ছে, যা দিয়ে স্বাভাবিকভাবে গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব নয়। দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে স্টেশন মালিকদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি চালক ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লাগার পর বন্ধ হয়ে যায়। দেশে দৈনিক প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের মধ্যে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে ৯০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়। একটি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় সরবরাহ প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট কমে বর্তমানে দৈনিক প্রায় ২১৫ কোটি ঘনফুটে নেমেছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান জনমান্দ মান্নান জানান, প্রকৌশলীরা টার্মিনালটি সচল করতে দিন-রাত কাজ করছেন। প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি হাতে এসেছে এবং দু-এক দিনের মধ্যে টার্মিনালটি পুনরায় চালু হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

