রাজধানীর মিরপুর-১০ গোলচত্বরে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে রাকিব হোসেন (২৯) নিহতের ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৫০ জনকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। একই মামলায় ৯৮ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১০০ জনকে আসামি করা হয়েছিল। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় ৪৯ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক মো. মমিনুল ইসলাম গত ১৩ জুলাই আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। তিনি জানান, তদন্ত শেষে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়ায় ৫০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ঘটনার সময় মিরপুর এলাকায় উপস্থিত না থাকা কিংবা অসৎ উদ্দেশ্যে এজাহারে নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে—এমন ৪৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিদের মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদ, পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান এবং সাবেক সংসদ সদস্য মাইনুল হোসেন খান নিখিল, কামাল আহমেদ মজুমদার ও ইলিয়াস মোল্লাসহ আরও কয়েকজন।
অব্যাহতির সুপারিশ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক এমপি ও আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন খান, কুষ্টিয়া-৩ আসনের সাবেক এমপি কামরুল আরেফিন, পাবনা-৪ আসনের সাবেক এমপি গালিবুর রহমান শরিফ, আলোক হেলথকেয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. লোকমান হোসেন এবং গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ইলিয়াস আহমেদ তালুকদার।
অভিযোগপত্রে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, ২০১৮ সালে সরকারি প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে কোটা বাতিলের প্রজ্ঞাপন জারির পর ২০২৪ সালের ৫ জুন উচ্চ আদালত ওই প্রজ্ঞাপন অবৈধ ঘোষণা করলে কোটা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে নামেন। একপর্যায়ে আন্দোলন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, আন্দোলন দমনে তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, উসকানিমূলক বক্তব্য ও আন্দোলন প্রতিহত করার অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, শেখ হাসিনাসহ অভিযুক্ত কয়েকজন গোপন বৈঠকের মাধ্যমে আন্দোলন দমনের বিষয়ে নির্দেশনা দেন এবং আন্দোলনকে সহিংসভাবে প্রতিহত করার ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিলেন।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই রাতে আন্দোলনকারীদের একটি মিছিল মিরপুর-১০ গোলচত্বরে পৌঁছালে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। এ সময় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির গুলিতে রাকিব হোসেন গলার বাম পাশে গুলিবিদ্ধ হন। স্থানীয়রা তাকে মিরপুরের ড. আজমল হসপিটালে নিয়ে গেলে রাত ৯টা ১৫ মিনিটে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
রাকিবের বাবা ও মামলার বাদী মো. আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে তিনি ঝিনাইদহ থেকে ঢাকায় আসেন। তৎকালীন পরিস্থিতিতে মরদেহের সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত ছাড়াই পরে ঝিনাইদহের হরিণাকুন্ডু উপজেলার বাসুদেবপুর পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় ২০ সেপ্টেম্বর মিরপুর মডেল থানায় মামলা করেন তিনি।
তদন্তের অংশ হিসেবে রাকিবের মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করে ময়নাতদন্তের জন্য আদালতে আবেদন করা হলেও পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের আপত্তির কারণে মরদেহ উত্তোলন করা সম্ভব হয়নি।
রাকিব ছিলেন আবু বক্কর সিদ্দিকের দুই ছেলের মধ্যে ছোট। তিনি মিরপুর ক্যান্টনমেন্টের এমআইএসটি থেকে ২০২১ সালে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি ডিগ্রি সম্পন্ন করে একটি প্রতিষ্ঠানের বনানী কার্যালয়ে সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মিরপুর-১১ এলাকায় একটি মেসে থাকতেন তিনি।
মামলার অভিযোগপত্র সম্পর্কে বাদী বলেন, তিনি প্রতিবেদন দাখিলের বিষয়ে অবগত নন। তবে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

