যে রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের হাত ধরে নতুন রাজনৈতিক পটভূমি, সেই অভ্যুত্থানের স্মারকই এখন আড়াল হয়ে গেছে নির্বাচনী প্রচারের জাঁকজমকে। ঠাকুরগাঁও শহরের পুরোনো বাসস্ট্যান্ড গোলচত্বরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নির্মিত ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’টি ঘিরে ফেলা হয়েছে দলীয় ব্যানার ও বিলবোর্ডে। আত্মত্যাগের প্রতীক ঢেকে ভোটের প্রচার চালানোয় ক্ষুব্ধ স্থানীয় ছাত্র-জনতা।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ছেড়ে দেওয়া ঠাকুরগাঁও-১ (সদর, রুহিয়া-ভূল্লী) আসনটি গত ২২ আগস্ট শূন্য ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। এই আসনে আগামী ২৯ অক্টোবর উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। প্রতীক বরাদ্দের পর গত বৃহস্পতিবার থেকে প্রার্থীরা প্রচারণা শুরু করেছেন। এর আগে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ দেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বুধবার গভীর রাত থেকেই শহরের প্রধান সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ব্যানার, ফেস্টুন ও বিলবোর্ড টাঙাতে শুরু করেন বিএনপির সমর্থকেরা। পুরোনো বাসস্ট্যান্ডের গোলচত্বরেও চলে প্রচারণা। বিএনপির সমর্থকেরা প্রথমে সেখানে ব্যানার টাঙালে স্মৃতিস্তম্ভটির একাংশ আড়াল হয়ে যায়। পরে বৃহস্পতিবার রাতে গোলচত্বরের ফাঁকা জায়গায় জামায়াতের কর্মীরা ব্যানার টাঙান এবং ওপরে বড় বড় বিলবোর্ড স্থাপন করেন। এতে স্তম্ভটির প্রায় পুরো অংশই আড়ালে পড়ে যায়।
এ আসনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন (ধানের শীষ), জামায়াতের দেলাওয়ার হোসেন (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের খাদেমুল ইসলাম (হাতপাখা), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আব্দুল আলীম নিজামী (বটগাছ) এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক (ডাব) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের আত্মত্যাগ ও বীরত্ব স্মরণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের ৬৪ জেলায় একই নকশায় জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে। এসব স্তম্ভে আন্দোলনের স্লোগান, গ্রাফিতি ও কবিতা খোদাই করা হয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ইতিহাস তুলে ধরাই এসব স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্দেশ্য।
ঠাকুরগাঁওয়ে জুলাই আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী আহছানুল হাবিব বলেন, জুলাই স্তম্ভ অভ্যুত্থানের সেই দিনের স্মৃতি বহন করে। যারা সেই স্তম্ভ ঢেকে দিয়েছেন, তাদের সতর্ক থাকতে হবে। জুলাইয়ের স্মৃতির এই স্তম্ভের ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে।
গোলচত্বর পার হয়ে যাওয়ার সময় স্মৃতিস্তম্ভটির এমন অবস্থা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন সালন্দর এলাকার বাসিন্দা আবুল হায়াত। তিনি বলেন, যে জুলাই অভ্যুত্থানের জন্য আমরা এই নির্বাচন পেলাম, সেই জুলাই স্মৃতিস্তম্ভটাই ব্যানার-বিলবোর্ড দিয়ে ঢেকে দিলাম। এতে বোঝা যায়, জুলাই বিপ্লব আমাদের মুখে থাকলেও আসলে বুকে নেই।
মেহেদী হাসান নামে এক শিক্ষার্থীও এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, যেসব শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে মানুষ আজ স্বাধীনভাবে কথা বলার সুযোগ পেয়েছে, তাদের স্মৃতিই নির্বাচনী প্রচারণার কারণে আড়াল হয়ে যাচ্ছে। এটি দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয়।
তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর জাতীয় কমিটির ঠাকুরগাঁওয়ে সদস্য সচিব মাহবুব আলম বলেন, জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ আমাদের সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। যারা নির্বাচন করছেন, তারা জুলাই অভ্যুত্থানকে ধারণ করে অনেক কথা বলেন। আথচ নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে এই স্তম্ভ ঢেকে দেবেন, এটা তাদের কাছে আশা করা যায় না। ব্যানার-বিলবোর্ড সরিয়ে স্মৃতিস্তম্ভটি দৃশ্যমান রাখার দাবি জানাই।
সাংস্কৃতিক কর্মী আব্দুলহ আল মামুন বলেন, নির্বাচনী প্রচারণার প্রতিযোগিতায় রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যানার-বিলবোর্ডে যখন শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছেয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভটি আড়ালে পড়ে যাওয়ার ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণ শুধু আনুষ্ঠানিকতার বিষয় নয়, এটি রাজনৈতিক ও সামাজিক দায়িত্বেরও অংশ।
বিএনপির নির্বাচনী প্রচারণা সেলের দায়িত্বে থাকা জেলা বিএনপির প্রচার সম্পাদক আহমেদুর রহমান কাজল বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান সব সময় আমাদের হৃদয়ে রয়েছে। সেটা ভোলার নয়। প্রচারণার দায়িত্বে থাকা কর্মীরা না বুঝেই স্তম্ভের সামনে ব্যানার টাঙিয়েছেন। আমাদের ব্যানার টাঙানোর পরও স্তম্ভটি অনেকটাই দৃশ্যমান ছিল। কিন্তু জামায়াত ফাঁকা জায়গাটুকুতে তাদের ব্যানার-বিলবোর্ড লাগিয়ে তা ঢেকে দিয়েছে।
জামায়াতের প্রচার বিভাগের দায়িত্বে থাকা মোহাম্মদ শাহজালাল জুয়েল বলেন, গোলচত্বরে ফাঁকা জায়গা না পাওয়ায় প্রচারণার দায়িত্বে থাকা কর্মীরা এ কাজ করেছেন। জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা আলোচনা করছি। সেখানে স্থাপন করা ধানের শীষের ব্যানার সরিয়ে নিলে আমরাও দাঁড়িপাল্লার ব্যানার-বিলবোর্ড সরিয়ে নেব।
ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। এ বিষয়ে আমাদের সচেতন হতে হবে। জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ ঘিরে যে ব্যানার-বিলবোর্ডে স্থাপন করা হয়েছে, তা সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে।

