বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও দলীয় চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন অভিযোগ করেছেন, একটি রাজনৈতিক দল সুপরিকল্পিতভাবে নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। লক্ষ্মীপুরে অবৈধভাবে ভোটের সিল তৈরির ঘটনা সেই ষড়যন্ত্রেরই স্পষ্ট ইঙ্গিত বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। একই সঙ্গে ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে জাল ভোট দেওয়ার উদ্দেশ্যে বিপুলসংখ্যক বোরকা ও নিকাব প্রস্তুত করার তথ্যও বিএনপির হাতে এসেছে বলে দাবি করেন তিনি।
শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর গুলশানে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন মাহদী আমিন।
তিনি বলেন, লক্ষ্মীপুরে ভোটে ব্যবহারের জন্য অবৈধ ছয়টি সিল উদ্ধারের ঘটনায় একটি প্রিন্টিং প্রেসের মালিক গ্রেপ্তার হয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানিয়েছেন—জামায়াতে ইসলামীর এক নেতার নির্দেশেই এসব সিল তৈরি করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, অভিযুক্ত ব্যক্তির হোয়াটসঅ্যাপ থেকে প্রাপ্ত অর্ডারের তথ্য, জব্দ করা আলামত এবং সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার প্রমাণও প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া গেছে। এসব তথ্য নির্বাচনকে প্রভাবিত করার একটি গভীর ষড়যন্ত্রের দিকে ইঙ্গিত করছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
মাহদী আমিন বলেন, “আমরা এই ঘটনায় জড়িত সব ব্যক্তি ও সংগঠনকে দ্রুত আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানাচ্ছি। নির্বাচন নিয়ে এ ধরনের কারসাজি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”
নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিটি ভোটকেন্দ্রের নারী কক্ষে পর্যাপ্তসংখ্যক নারী পোলিং অফিসার নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী নারী ভোটারদের পরিচয় যাচাইয়ের সময় অবশ্যই মুখমণ্ডল উন্মুক্ত করে সনাক্তকরণ কার্যকর করতে হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র বা হজের ছবি তোলার সময় যেভাবে মুখ খোলা রাখা বাধ্যতামূলক, ঠিক একইভাবে ভোটগ্রহণের সময় নারী পোলিং অফিসারের সামনে মুখ খুলে পরিচয় নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ভোটের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষায় নারী ভোটকেন্দ্রে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে যথাসম্ভব নারী পোলিং এজেন্ট নিয়োগ নিশ্চিত করাও জরুরি বলে তিনি মত দেন।
বিএনপির এই নেতা আরও বলেন, অতীতেও দেখা গেছে ওই রাজনৈতিক দলটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহ করেছে। এসব কর্মকাণ্ডের কারণে জাল ভোটের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এমনকি অতিরিক্ত ব্যালট ছাপানোর প্রস্তুতির তথ্যও বিএনপির কাছে এসেছে বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, সম্প্রতি রাজধানীর পুরান ঢাকার সূত্রাপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একটি বাড়ি থেকে ক্রিকেট খেলার ১৫২টি স্ট্যাম্প উদ্ধার করেছে, যা ওই রাজনৈতিক দলের এক নেতার বাড়ি বলে জানা গেছে। মাহদী আমিন প্রশ্ন তোলেন, “তাহলে কি তারা নির্বাচনের সময় দেশজুড়ে সহিংসতা সৃষ্টির প্রস্তুতি নিচ্ছে?” এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নজরদারি আরও বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও অভিযোগ করেন, আসন্ন নির্বাচনে পর্যবেক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও গুরুতর অনিয়ম লক্ষ্য করা যাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি পিপলস অ্যাসোসিয়েশন ফর সোশ্যাল অ্যাডভান্সমেন্ট (পাশা) নামের একটি সংস্থার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, মোট ৫৫ হাজার ৪৫৪ জন দেশি পর্যবেক্ষকের মধ্যে এককভাবে এই সংস্থাকে ১০ হাজার ৫৫৯ জন পর্যবেক্ষক নিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অথচ বাস্তবে হবিগঞ্জের একটি গ্রামের বাসার একটি কক্ষই তাদের তথাকথিত কার্যালয় এবং লোকবল বলতে একজন মাত্র—যা ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
মাহদী আমিন বলেন, এর আগেও নির্বাচন কমিশনকে জানানো হয়েছে যে, পর্যবেক্ষকের নামে অনুমোদনপ্রাপ্ত কিছু প্রতিষ্ঠানের একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এসব বিষয় একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথে বড় অন্তরায় সৃষ্টি করছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, “আমরা নির্বাচন কমিশন ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আবারও আহ্বান জানাচ্ছি—অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে একটি প্রকৃত ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।”
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির আগামী নির্বাচনি কর্মসূচির কথাও জানান মাহদী আমিন। তিনি বলেন, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান আগামীকাল রোববার ঢাকা মহানগর উত্তরের ছয়টি নির্বাচনি আসনে জনসভায় অংশ নেবেন। এসব জনসভা অনুষ্ঠিত হবে ঢাকা-১৭, ঢাকা-১৬, ঢাকা-১৫, ঢাকা-১৪, ঢাকা-১৩ ও ঢাকা-১১ আসনে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী।
এছাড়া সোমবার তারেক রহমান তার নিজ নির্বাচনি এলাকা সহ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাতটি আসনে মোট আটটি নির্বাচনি জনসভায় বক্তব্য রাখবেন বলে জানান তিনি।

