ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা কে হবেন, তা নিয়ে তেহরানে যখন জোর আলোচনা চলছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক মন্তব্য নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ওয়াশিংটনের সমর্থন ছাড়া ইরানের নতুন কোনো নেতৃত্ব দীর্ঘদিন টিকতে পারবে না। অন্যদিকে তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তারা কোনো ধরনের আত্মসমর্পণ করবে না এবং প্রতিরোধ চালিয়ে যাবে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানের পরবর্তী নেতাকে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন নিতে হবে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যদি কোনো নেতা যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন না পান, তবে তার ক্ষমতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। এই বক্তব্যের মাধ্যমে ইরানের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য প্রভাবের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
ইরানের অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচনা করছে—এমন খবরের প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প তাকে অযোগ্য নেতা হিসেবে কটাক্ষ করেন। একই সময়ে ইরানের শীর্ষ রাজনীতিক আলী লারিজানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে হুঁশিয়ারি দিলে ট্রাম্প তা গুরুত্ব না দিয়ে বলেন, তিনি লারিজানিকে চেনেন না এবং বিষয়টি নিয়ে মাথা ঘামান না।
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, তিনি প্রতি দশ বছর অন্তর মধ্যপ্রাচ্যে একই ধরনের সংঘাতে জড়াতে চান না। তাই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করা এবং একটি গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তির সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে বলেন, নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।
তবে ট্রাম্পের এই বক্তব্য সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরান তার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো বিদেশি হস্তক্ষেপ মেনে নেবে না। তিনি জানান, আত্মসমর্পণ কিংবা সহজে যুদ্ধবিরতির পথে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।
আরাগচি আরও বলেন, অতীতে সংঘাতের পর যুদ্ধবিরতি হয়েছে, কিন্তু ভবিষ্যতে একই পরিস্থিতি তৈরি হলে ইরান বারবার সেই পথ অনুসরণ করবে না। তার মতে, বারবার হামলার পর যুদ্ধবিরতি মানা বাস্তবসম্মত নয়।
এদিকে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের ক্ষমা চাওয়ার বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে আরাগচি বলেন, সেটি ছিল মার্কিন হামলার কারণে সৃষ্ট মানবিক দুর্ভোগ নিয়ে দুঃখ প্রকাশ মাত্র। তার মতে, প্রকৃত ক্ষমা চাওয়া উচিত যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেই।
ইরানে নতুন সর্বোচ্চ নেতার অভিষেককে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী প্রস্তুতি চলছে। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন ইঙ্গিত দিয়েছে, ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতর থেকেও যদি কোনো গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব উঠে আসে, তবে যুক্তরাষ্ট্র তা বিবেচনা করতে পারে। তবে সেই গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ড কী হবে, তা স্পষ্ট নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর শুরু হওয়া এই পরিস্থিতি এখন শুধু সামরিক নয়, বরং রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বেও রূপ নিয়েছে। ট্রাম্পের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দাবি এবং ইরানের প্রতিরোধের অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিকে আরও অস্থির করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

