ইসলামাবাদের রুদ্ধদ্বার বৈঠক থেকে যখন কোনো চূড়ান্ত ফয়সালা ছাড়াই দুই দেশের প্রতিনিধিরা বেরিয়ে এলেন, তখনই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে বিশ্বরাজনীতি এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার পথে ধাবিত হচ্ছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বহুল প্রতীক্ষিত এই সমঝোতা ব্যর্থ হওয়া কেবল দুটি রাষ্ট্রের কূটনৈতিক পরাজয় নয়, বরং তা বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য এক অশনিসংকেত। এখন সবার মনে একটাই প্রশ্ন—আলোচনার টেবিল যদি শেষ পর্যন্ত শূন্যই থাকে, তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে বিকল্প কী? ২১ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির সময়সীমা শেষ হওয়ার পর ট্রাম্প কি আবারও সেই চিরচেনা যুদ্ধের ডঙ্কা বাজাবেন, নাকি পর্দার আড়ালে নতুন কোনো সমীকরণের সন্ধান করবেন? এই ভূ-রাজনৈতিক দাবার চালে উভয় পক্ষই এখন এমন এক বিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে, যেখান থেকে পিছু হটা মানেই পরাজয় স্বীকার করা, আর সামনে আগানো মানে এক অনিয়ন্ত্রিত মহাপ্রলয়কে আমন্ত্রণ জানানো।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো পুনরায় বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর হুমকি দেওয়া। দুই সপ্তাহের চলমান যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসছে এবং ট্রাম্প প্রশাসন এই সময়সীমাকে একটি মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। হোয়াইট হাউস থেকে বারবার ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে যে, সমঝোতা না হলে আকাশপথে হামলার তীব্রতা আগের চেয়ে বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তববাদী বিশ্লেষকদের মতে, এই সামরিক হুমকি যতটা না বাস্তবসম্মত, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশল। ট্রাম্পের জন্য এই মুহূর্তে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়ানো রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী হতে পারে। তিনি সবসময় ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন, এখন আবার নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যের অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপ দেওয়া তার নিজের রাজনৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে। তাছাড়া মার্কিন পেন্টাগনের সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ রিপোর্টগুলো বলছে, ইরানের মোবাইল মিসাইল লঞ্চার এবং ভূগর্ভস্থ ড্রোন ঘাঁটিগুলো ধ্বংস করা কেবল আকাশপথের হামলায় সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন বড় মাপের স্থল অভিযান, যার ঝুঁকি নেওয়ার মতো অবস্থায় বর্তমানে পেন্টাগন নেই। ইরানিরা গত কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞা এবং সাম্প্রতিক হামলার ধাক্কা সামলে নিজেদের প্রতিরোধের এক নতুন স্তরে নিয়ে গেছে। তারা ভালো করেই জানে, ট্রাম্পের এই হুঙ্কার মূলত একটি অচলাবস্থা ভাঙার মরিয়া চেষ্টা মাত্র।
এই সংকটের সবচেয়ে স্পর্শকাতর এবং গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহের এই পথটি বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে বৈশ্বিক অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড থমকে যাওয়া। গত সপ্তাহে ট্রাম্প যখন আকস্মিকভাবে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিলেন, তখন অনেকে একে মানবিক মহানুভবতা মনে করলেও আসলে তা ছিল এক চরম অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা। আন্তর্জাতিক এনার্জি এজেন্সির তথ্যমতে, হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার কারণে তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এর ফলে কেবল পরিবহন খরচই বাড়েনি, বরং সার এবং সেমিকন্ডাক্টর তৈরির অপরিহার্য উপাদান হিলিয়ামের মতো উপকরণের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। মার্কিন অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি ইতিমধ্যেই ৩.৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যা সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে। যদি ২১ এপ্রিলের পর পুনরায় যুদ্ধ শুরু হয়, তবে গোল্ডম্যান স্যাকস বা জেপি মরগানের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, মার্কিন শেয়ারবাজারে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকে অন্তত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ধস নামতে পারে। এই অর্থনৈতিক বিপর্যয় সামাল দেওয়ার ক্ষমতা বর্তমান প্রশাসনের নেই বললেই চলে। তেলের উচ্চমূল্য এবং বাজারে নিত্যপণ্যের ঘাটতি ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ জনপ্রিয়তায় বড় ধরনের ধস নামাতে পারে, যা নির্বাচনী বছরে তার জন্য আত্মঘাতী হবে।
ইসলামাবাদ আলোচনায় ইরান যে তালিকা পেশ করেছে, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং কৌশলী। তারা এখন আর কেবল পরমাণু চুক্তিতে সীমাবদ্ধ নেই। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে হরমুজ প্রণালির নিরবচ্ছিন্ন নিয়ন্ত্রণ, পরমাণু ইস্যু, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি বাবদ বিপুল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ এবং গত দুই দশকের সকল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো বিষয়গুলো উঠে এসেছে। এক সময় যে হরমুজ প্রণালি কোনো আলোচনার বিষয়ই ছিল না, এখন তা ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী কূটনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—তেল যদি আমরা রফতানি করতে না পারি, তবে বিশ্বের অন্য কেউও এই পথ দিয়ে নির্বিঘ্নে তেল নিতে পারবে না। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) ইতিমধ্যে এই জলপথে তাদের মাইন এবং ফাস্ট-অ্যাটাক বোটের মহড়া বাড়িয়ে দিয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরানের যে ভৌত অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে, তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে নগদ অর্থ দিতে হবে—ইরানের এই দাবি ওয়াশিংটন সরাসরি ‘অযৌক্তিক’ বলে প্রত্যাখ্যান করলেও তেহরান একে জাতীয় মর্যাদার প্রশ্ন হিসেবে সামনে এনেছে। অন্যদিকে, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ‘ধাপে ধাপে’ আগানোর যে প্রস্তাব দিয়েছে, ইরান তা স্রেফ উড়িয়ে দিয়েছে। তেহরানের সাফ কথা, ওবামা আমলের জেসিপিওএ চুক্তির তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে তারা শিখেছে যে, মৌখিক প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করা যায় না। তাদের অবস্থান এখন ‘সব অথবা কিছুই না’ নীতিতে অটল।
আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পেছনে একটি বড় কারণ হলো উভয় পক্ষের ‘বিজয়ীর মনস্তত্ত্ব’ বা ইগো। ওয়াশিংটন মনে করছে, তাদের নজিরবিহীন ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার’ এবং বোমাবর্ষণ ইরানকে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করেছে, যা ট্রাম্পের কঠোর পররাষ্ট্রনীতির সার্থকতা। অন্যদিকে, তেহরান মনে করছে, বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তির সর্বাত্মক আক্রমণ সত্ত্বেও তারা কেবল টিকেই থাকেনি, বরং হরমুজ প্রণালির চাবিকাঠি হাতে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে। যখন কোনো পক্ষই নিজেকে পরাজিত মনে করে না এবং আপসের মেজাজে থাকে না, তখন কূটনীতি সেখানে মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য। বর্তমানে দুই পক্ষই যে অবস্থানে অনড় হয়ে আছে, তাতে ২১ এপ্রিলের পর একটি সংঘাতময় পরিস্থিতির সম্ভাবনা অত্যন্ত প্রকট। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলোও এখন দুই ভাগে বিভক্ত। ইসরায়েল এবং কিছু আরব রাষ্ট্র যখন ইরানকে আরও চাপে ফেলার জন্য ওয়াশিংটনকে উস্কানি দিচ্ছে, তখন ওমান বা কাতারের মতো মধ্যস্থতাকারীরা প্রমাদ গুনছে। কারণ যুদ্ধ শুরু হলে এর আঁচ কেবল তেহরান বা ওয়াশিংটনে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা পুরো অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোকে পুড়িয়ে ছারখার করে দেবে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই সংকটের আরেকটি ডাইমেনশন হলো চীন ও রাশিয়ার ভূমিকা। বেইজিং ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছে যে, ইরানের ওপর নতুন করে জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে তারা তা মেনে নেবে না। ইরানের সাথে চীনের ২৫ বছর মেয়াদী কৌশলগত অংশীদারিত্ব এখন আর কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ নয়। অন্যদিকে, ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যস্ত রাশিয়াও চাইবে মধ্যপ্রাচ্যে একটি দ্বিতীয় ফ্রন্ট খুলে দিতে, যাতে মার্কিন মনোযোগ এবং সমরসম্ভার সেখানে ডাইভার্ট হয়। ফলে ট্রাম্পকে কেবল ইরানের সাথে লড়তে হচ্ছে না, বরং তাকে এই বিশাল বৈশ্বিক অক্ষের বিরুদ্ধেও সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। যদি ট্রাম্প পুনরায় হামলা শুরু করেন, তবে ইরান থেকে চিনে তেল সরবরাহ বিঘ্নিত হবে, যা বেইজিংকে সরাসরি ক্ষুব্ধ করবে। এই অবস্থায় মার্কিন অর্থনীতি কেবল মুদ্রাস্ফীতি নয়, বরং বড় ধরনের বাণিজ্যিক যুদ্ধের সম্মুখীন হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের সামনে বিকল্প পথগুলো অত্যন্ত সংকীর্ণ। সামরিক হুঙ্কার দেওয়া সহজ, কিন্তু তা বাস্তবায়ন করার অর্থ হলো নিজের দেশের অর্থনীতিকে এক অনিশ্চিত অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া। অন্যদিকে, ইরানের সব দাবি মেনে নেওয়া মানে রাজনৈতিকভাবে আত্মসমর্পণ করা। বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্প হয়তো কোনো গোপন চ্যানেলে ইরানের কিছু দাবি আড়ালে মেনে নিয়ে একটি ‘অসন্তোষজনক’ বা অপূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করবেন। একে হয়তো ‘ডিল অফ দ্য সেঞ্চুরি’ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করার চেষ্টা করবে হোয়াইট হাউস, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তা হবে এক বিশাল আপস। সময়ের পাল্লা এখন তেহরানের দিকে হেলে আছে, কারণ বিশ্ব অর্থনীতির চাবিকাঠি এখন হরমুজ প্রণালির সংকীর্ণ জলপথে আটকে আছে।
ট্রাম্পকে যদি মার্কিন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখতে হয় এবং শেয়ারবাজারের পতন আটকাতে হয়, তবে তাকে হয়তো জেদ কমিয়ে শেষ পর্যন্ত বাস্তববাদী হতেই হবে। কারণ দিনশেষে সমরশক্তির চেয়েও পেটের দায় এবং অর্থনীতির গতি অনেক বেশি শক্তিশালী হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে। ২১ এপ্রিল কেবল একটি তারিখ নয়, এটি ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মধ্যপ্রাচ্যের বালুচরে অনেক পরাশক্তির দম্ভ চূর্ণ হয়েছে; ট্রাম্প কি সেই ভুল থেকে শিখবেন, নাকি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটাবেন, তা কেবল সময়ই বলে দেবে। তবে এই মুহূর্তে শান্তির সম্ভাবনা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছে, আর যুদ্ধের দামামা বাজছে প্রশান্ত মহাসাগর থেকে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত। বিশ্বের সাধারণ মানুষ কেবল এটাই আশা করতে পারে যে, শেষ মুহূর্তে হলেও শুভবুদ্ধির উদয় হবে এবং বন্দুকের নলের বদলে সংলাপের মাধ্যমে এই মহাবিপদ এড়ানো সম্ভব হবে। অন্যথায়, একবিংশ শতাব্দীর এই সংকট কেবল মানচিত্র নয়, বদলে দেবে পুরো বিশ্বব্যবস্থাকেই।

