বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক উৎসব হলো পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ। এটি কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে নতুন একটি বছরে পদার্পণ নয়, বরং এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি এবং হাজার বছরের ঐতিহ্যের এক মহা-মিলনমেলা। ঋতুচক্রের আবর্তনে রুদ্র বৈশাখ যখন জীর্ণতাকে ধুয়ে মুছে নতুন প্রাণের স্পন্দন নিয়ে আসে, তখন সমগ্র বাঙালি জাতি ভেদাভেদ ভুলে এক অভিন্ন মোহনায় এসে মিলিত হয়। মুঘল সম্রাট আকবরের সময় থেকে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে যে ‘ফসলি সন’ বা বঙ্গাব্দের সূচনা হয়েছিল, তা আজ আমাদের জাতীয় সত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পহেলা বৈশাখ মানেই ভোরের প্রথম সূর্যকে স্বাগত জানানো, নতুন পোশাকে নিজেকে সাজানো এবং ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ সুরে বিশ্ব চরাচরকে আহ্বান করা। গ্রামীণ জনপদে এই দিনটি শুরু হয় হালখাতার খেরো খাতা খোলার মাধ্যমে, যেখানে পুরনো বছরের দেনা-পাওনা মিটিয়ে নতুন করে শুরুর এক অপার সম্ভাবনা ফুটে ওঠে। ব্যবসায়ীরা মিষ্টিমুখের মাধ্যমে ক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্কের যে নতুন সেতু নির্মাণ করেন, তা বাঙালির চিরন্তন সৌহার্দ্যেরই প্রতিফলন। অন্যদিকে নগর জীবনে পহেলা বৈশাখ পেয়েছে এক বর্ণিল এবং আধুনিক রূপ, যার কেন্দ্রে রয়েছে মঙ্গল শোভাযাত্রা।
ইউনেস্কোর অস্পৃশ্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এই শোভাযাত্রা আজ কেবল উৎসব নয়, বরং অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভবোধের বিজয়ের প্রতীক। মাটির সরাচিত্র, বিশালকায় পাখি, বাঘের মুখাবয়ব আর লোকজ ঐতিহ্যের নানা অনুষঙ্গ নিয়ে যখন তরুণ-বৃদ্ধ নির্বিশেষে রাজপথে নামে, তখন মনে হয় প্রতিটি কদমই যেন আমাদের আদি শেকড়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নববর্ষ উদযাপনের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রতিটি জাতিই তাদের সংস্কৃতিকে নতুনত্বের মোড়কে তুলে ধরে। চীনা নববর্ষ বা ‘লুনার নিউ ইয়ার’ যেমন ড্রাগন নাচ আর লাল লণ্ঠনের মাধ্যমে পরিবার ও পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর উৎসবে পরিণত হয়, তেমনি পারস্যের ‘নওরোজ’ উৎসব প্রকৃতির পুনর্জাগরণকে উদযাপন করে। এমনকি থাইল্যান্ডের ‘সংক্রান’ উৎসব পানির মাধ্যমে পুরনো গ্লানি ধুয়ে ফেলার শিক্ষা দেয়। স্কটল্যান্ডের ‘হগমানে’ উৎসব যেমন আগুনের মশাল জ্বালিয়ে পুরনোকে বিদায় দেয়, তেমনি বাঙালির বৈশাখও ঠিক তেমনইÍএটি কেবল আনন্দ-উল্লাস নয়, বরং আত্মশুদ্ধির এক গভীর প্রক্রিয়া। বিগত বছরের দুঃখ, গ্লানি আর ব্যর্থতাকে পেছনে ফেলে নতুন উদ্দীপনায় জেগে ওঠাই এর মূল মন্ত্র।
আমাদের দেশীয় প্রেক্ষাপটে পহেলা বৈশাখ আজ রাজনৈতিক এবং সামাজিক অস্থিরতার বিরুদ্ধে এক বড় ঢাল। যখনই উগ্রবাদ বা অপসংস্কৃতি আমাদের গ্রাস করতে চেয়েছে, বাঙালি তার সাংস্কৃতিক শক্তি দিয়ে বিশেষ করে বৈশাখের আবাহনে তাকে প্রতিহত করেছে। ছায়ানটের বটমূলের গানের সুর বা চারুকলার আলপনা আমাদের শিখিয়ে দেয়, আমরা প্রথমত বাঙালি এবং আমাদের শক্তি আমাদের বৈচিত্র্যের মধ্যে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পহেলা বৈশাখ আমাদের অর্থনীতিতেও এক বিশাল সঞ্চার তৈরি করে। এই দিনকে কেন্দ্র করে দেশি তাঁতশিল্প, মৃৎশিল্প এবং কুটির শিল্পের যে জোয়ার আসে, তা গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতে অনন্য ভূমিকা পালন করে। আধুনিক করপোরেট দুনিয়ায় যখন পশ্চিমা সংস্কৃতির জয়জয়কার, তখন পহেলা বৈশাখ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মাটির টানেই আমাদের মুক্তি।
তবে বর্তমান সময়ে পহেলা বৈশাখের উদযাপনে কিছু বিচ্যুতি এবং কৃত্রিমতা আমাদের ভাবিয়ে তোলে। আধুনিকতার দোহাই দিয়ে অনেক সময় আমরা মূল ঐতিহ্যকে ছাপিয়ে বাণিজ্যিকীকরণকে প্রাধান্য দিই। পান্তা-ইলিশ খাওয়ার যে হুজুগ ইদানীং দেখা যায়, তা আসলে বৈশাখের আদি সংস্কৃতির অংশ ছিল না বরং এটি একটি সাম্প্রতিক সংযোজন যা অনেকটা লোকদেখানো উৎসবে পরিণত হয়েছে। পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, বৈশাখের এই ইলিশ-বিলাসিতা আমাদের মৎস্য সম্পদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ঐতিহ্যের নামে প্রকৃতিকে ধ্বংস করা কোনোভাবেই বৈশাখী চেতনার সঙ্গে যায় না। আবার অন্যদিকে, নগরায়নের চাপে গ্রামীণ মেলাগুলো তার জৌলুস হারাচ্ছে। নাগরদোলা, মাটির পুতুল, বায়োস্কোপ কিংবা মুড়ালি-বাতাসার সেই দিনগুলো এখন কেবল স্মৃতির অ্যালবামে বন্দি হয়ে যাচ্ছে।
আমাদের উচিত এই লোকজ অনুষঙ্গগুলোকে আধুনিক জীবনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে টিকিয়ে রাখা। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পহেলা বৈশাখের তাৎপর্য কেবল একদিনের ছুটি বা রঙিন পোশাকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, তাদের শেখাতে হবে এই উৎসবের পেছনের ইতিহাস এবং এর অসাম্প্রদায়িক দর্শনের কথা। যদি আমরা আমাদের সন্তানদের শেকড়ের খবর না দিই, তবে তারা বিশ্বায়নের ঝড়ে নিজেদের পরিচয় হারিয়ে ফেলবে। বিদেশি সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ নয়, বরং নিজস্ব ঐতিহ্যের ওপর দাঁড়িয়ে বিশ্বকে চেনার নামই হলো প্রকৃত শিক্ষা, আর পহেলা বৈশাখ সেই শিক্ষার সবচেয়ে বড় পাঠশালা। নববর্ষের এই আনন্দধারা যেন কেবল উচ্চবিত্ত বা শহুরে মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, তা যেন শ্রমজীবী মানুষের জীবনেও একটু স্বস্তির নিশ্বাস হয়ে আসে।
বাঙালির বৈশাখ কেবল উৎসবে সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি আন্দোলনের নামও বটে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময় থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তীকালে সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনে পহেলা বৈশাখ ছিল বাঙালির অনুপ্রেরণার উৎস। রমনার বটমূলে যখন বোমা হামলা হয়, তখন বাঙালি দমে যায়নি, বরং দ্বিগুণ শক্তিতে জেগে উঠেছিল। এই যে প্রতিকূলতা জয় করার ক্ষমতা, এটিই বৈশাখের প্রকৃত শিক্ষা। জাপানিদের ‘ওশোগাতসু’ বা নববর্ষ উদযাপনে তারা যেমন ‘কাদোমাতসু’ সাজিয়ে দেবতাকে স্বাগত জানায়, আমরাও তেমনি মঙ্গলের কামনায় আলপনা আঁকি। এই বিশ্বজনীনতা আমাদের গর্ব। কিন্তু আধুনিক সময়ে এসে আমরা দেখি যে, গ্রামীণ অর্থনীতির সেই মেলাগুলো এখন প্লাস্টিকের খেলনায় সয়লাব হয়ে যাচ্ছে। মাটির হাঁড়ি-পাতিল বা কাঠের খেলনার জায়গা দখল করছে সস্তা কৃত্রিম পণ্য। এটি আমাদের লোকজ শিল্পের জন্য একটি অশনিসংকেত।
আমাদের মৃৎশিল্পীদের যদি আমরা পৃষ্ঠপোষকতা না করি, তবে হাজার বছরের এই দক্ষতা হারিয়ে যাবে। পহেলা বৈশাখ আমাদের সুযোগ করে দেয় এই শিল্পীদের পাশে দাঁড়ানোর। আমাদের ফ্যাশন হাউসগুলো এখন বৈশাখী পোশাকের বিশাল বাজার তৈরি করেছে, যা ইতিবাচক; কিন্তু এর ডিজাইন ও মোটিফে যেন দেশীয় ঐতিহ্যের প্রতিফলন থাকে, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। বাঙালির নববর্ষের মূল সুর হলো সারল্যÍএই সারল্যকে বিসর্জন দিয়ে চাকচিক্যের পেছনে দৌড়ালে বৈশাখের আত্মা ক্ষুণ্ন হয়।
আগামীর পহেলা বৈশাখ হোক আরও বেশি মানবিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক। কেবল রাজধানী বা বড় শহরগুলোতে সীমাবদ্ধ না থেকে এই উৎসবের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ুক প্রতিটি প্রান্তে। বর্তমানের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতাকে কাজে লাগিয়ে আমরা আমাদের এই সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে বিশ্ব দরবারে আরও বলিষ্ঠভাবে উপস্থাপন করতে পারি। কিন্তু তার আগে প্রয়োজন আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন। পহেলা বৈশাখ আমাদের শেখায় সাম্য, ভ্রাতৃত্ব আর অকৃত্রিম দেশপ্রেম। এই দিনটিতে আমরা যেমন নতুন হালখাতা খুলি, তেমনি আমাদের চিন্তা ও মননেও যেন একটি নতুন ‘হালখাতা’ খোলা হয়, যেখানে ঘৃণা আর বিভেদের কোনো স্থান থাকবে না। বৈশাখ মানেই তো নতুনের কেতন উড়ানো, জরাজীর্ণকে বিসর্জন দেওয়া। তাই এই দিনে শপথ নেওয়া উচিত যেন আমরা আমাদের মাটিকে, আমাদের নদীকে আর আমাদের হাজার বছরের এই ভাষিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে রক্ষা করি। কালবৈশাখীর ঝড় যেমন প্রকৃতির আবর্জনা ধুয়ে পরিষ্কার করে দেয়, আমাদের সমাজ থেকেও যেন সকল অন্ধকার আর গোঁড়ামি দূর হয়ে যায়। বৈশাখের প্রচণ্ড দাবদাহ যেমন বৃষ্টির প্রত্যাশা তৈরি করে, তেমনি আমাদের সমাজও যেন শান্তি ও সুবাতাসের প্রতীক্ষায় ঐক্যবদ্ধ থাকে।
পহেলা বৈশাখ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা নদীমাতৃক পলিমাটির সন্তান। আমাদের গান, আমাদের সুর আর আমাদের প্রার্থনা-সবকিছুই মাটির গন্ধে মাতোয়ারা। তাই আকাশ সংস্কৃতি বা ভিনদেশি উৎসবের ভিড়ে আমরা যেন আমাদের এই অমূল্য রতনকে হারিয়ে না ফেলি। প্রতিটি ঘরে ঘরে অন্ন আর মুখে হাসি ফুটুক, নববর্ষের প্রথম প্রভাতে এটাই হোক একমাত্র প্রার্থনা। বাংলার শাশ্বত রূপ যেন অক্ষুণ্ণ থাকে এবং বৈশাখের রুদ্র তেজে আমরা যেন প্রতিনিয়ত অশুভের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি পাই। বাঙালির এই জয়যাত্রা চলুক যুগ যুগ ধরে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরেÍশেকড়ের টানে, প্রাণের স্পন্দনে। নতুন প্রজন্মকে বৈশাখী মেলার সেই বাঁশির সুর শোনানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। কারণ এই সুরেই মিশে আছে আমাদের হাজার বছরের ইতিহাস। বৈশাখ মানেই লড়াই করে টিকে থাকার সাহস, বৈশাখ মানেই নতুন করে স্বপ্ন দেখার প্রেরণা। এই উৎসবের রঙে রঙিন হোক প্রতিটি বাঙালির মন, আর সেই রঙের উজ্জ্বলতা যেন ছড়িয়ে পড়ে দিগদিগন্তে। অশুভ বিনাশী এই দিনে আমাদের সংকল্প হোক-আমরা থাকব মাটির কাছাকাছি, থাকব একে অপরের পাশে। পহেলা বৈশাখ কেবল একটি দিন নয়, এটি বাঙালির চিরকালীন জীবনীশক্তি। শুভ নববর্ষ।

