যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার এক বাজারে উজ্জ্বল একটি পর্দার সামনে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন শত শত মানুষ। পর্দায় চলছে বিশ্বকাপের ম্যাচ। ধ্বংসস্তূপ আর অনিশ্চয়তার মাঝেও ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা তাদের একত্র করেছে।
ফিলিস্তিনি ফুটবলপ্রেমীদের কাছে মিশরের তারকা স্ট্রাইকার মোহাম্মদ সালাহ এক জীবন্ত কিংবদন্তি। তার দলের ম্যাচ দেখতে গাজার বিভিন্ন এলাকা থেকে জড়ো হন সমর্থকেরা। ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র হলেও উল্লাসে কোনো কমতি ছিল না। কেউ বন্ধুর কাঁধে উঠে মিশরের পতাকা উড়িয়েছেন, কেউবা আনন্দ ভাগ করে নিয়েছেন চারপাশের মানুষের সঙ্গে।
তবে এই আনন্দের আড়ালে লুকিয়ে আছে গাজার কঠিন বাস্তবতা। দীর্ঘদিনের ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ অঞ্চলটিকে ব্যাপক ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। নুসেইরাত এলাকার ভাঙাচোরা পরিবেশের মাঝেও বিশ্বকাপ যেন মানুষকে কিছুক্ষণের জন্য ভুলিয়ে দেয় ভয়, শোক ও অনিশ্চয়তার জীবন।
ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য মোস্তফা সিয়াম বলেন, গাজাবাসীর জন্য বিশ্বকাপ শুধু একটি খেলা নয়, এটি তাদের সীমাহীন যন্ত্রণা ও উদ্বেগ থেকে সাময়িক মুক্তির উপলক্ষ। সংকটের মধ্যেও স্থানীয় ক্যাফে মালিকরা মানুষের মাঝে পুরোনো দিনের ফুটবল উৎসব ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন।
মধ্য গাজার আল-জাওয়াইদার বাস্তুচ্যুতদের শিবিরে একটি ছোট টেলিভিশন ঘিরে বসে মানুষ বিশ্বকাপ উপভোগ করছেন। বালুর মেঝে, প্লাস্টিকের চেয়ার ও জেনারেটরের শব্দের মধ্যেই তৈরি হয়েছে তাদের ছোট্ট ফুটবল উৎসব।
দর্শক ঈদ আল-আত্তার বলেন, স্টেডিয়ামে বসে বিশ্বকাপ দেখা এখন আমাদের জন্য কেবল স্বপ্ন। অবরুদ্ধ জীবনের কারণে গাজার বাইরে গিয়ে খেলা দেখার সুযোগ তাদের নেই।
গাজা সিটির বাসিন্দা মাজেন আল-গুল বলেন, যখন বিশ্বের মানুষ বিশ্বকাপের আনন্দে মেতে ওঠে, তখন গাজার মানুষ আশ্রয়, বিদ্যুৎ ও শিক্ষার মতো মৌলিক প্রয়োজন থেকে বঞ্চিত। এই বৈপরীত্য তাদের মনে গভীর হতাশা তৈরি করে।
অনেকে স্মরণ করেন ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সময়ের প্রাণচঞ্চল গাজার কথা। তখন স্টেডিয়াম ও বিভিন্ন ভেন্যুতে হাজারো মানুষ একসঙ্গে খেলা দেখতেন। কিন্তু যুদ্ধের কারণে সেই স্টেডিয়াম ও বিনোদন কেন্দ্রগুলোর অনেকটাই এখন ধ্বংস হয়ে গেছে।
বর্তমানে তাঁবুতে বসবাস করা মার্বান আল-শেখ বলেন, একসময় বন্ধুদের সঙ্গে ক্যাফেতে খেলা দেখার আনন্দ ছিল অন্যরকম। আজ যুদ্ধ তাদের জীবন ও পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দিয়েছে।
অন্যদিকে দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের সমুদ্র সৈকতে চলছে আরেক ধরনের বিশ্বকাপ। বালুর ওপর খালি পায়ে ফুটবল খেলছেন একদল তরুণ। কোচ মোহাম্মদ আবু তাহ বলেন, ফুটবলই তাদের বেঁচে থাকার শক্তি ও সাময়িক মুক্তির পথ। ভাঙা কংক্রিটের ব্লকে বসে খেলা দেখা দর্শকদের ভালোবাসাই তাদের এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা।

