ফরিদপুরে পেঁয়াজের বাম্পার উৎপাদন হলেও বাজারে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। উৎপাদন খরচের তুলনায় অর্ধেকেরও কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় অনেকেই বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন। ক্ষোভ ও হতাশা থেকে কেউ কেউ বাজারে না নিয়ে পেঁয়াজ ডোবায় ফেলে দিচ্ছেন। এমন চিত্র দেখা গেছে ফরিদপুরের সালথা উপজেলার খোয়াড় গ্রামে।
রোববার (২৮ জুন) সালথা বাজারে পেঁয়াজ বিক্রি করতে আসা কৃষক আহম্মদ মাতুব্বর বলেন, সার, বীজ, সেচ, শ্রমিক ও কীটনাশকের মূল্য বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় কয়েকগুণ বেড়েছে। অথচ বর্তমানে এক মণ পেঁয়াজ বিক্রি করে যে অর্থ পাওয়া যায়, তা দিয়ে এক কেজি গরুর মাংসও কেনা সম্ভব নয়। এভাবে লোকসান গুনতে হলে আগামী মৌসুমে পেঁয়াজ চাষ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
খোয়াড় গ্রামের কৃষক দাউদ মাতুব্বর জানান, তিনি এবার প্রায় সাত বিঘা জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করেছেন। প্রতি বিঘায় খরচ হয়েছে প্রায় ১ লাখ থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা। তার হিসাবে প্রতি মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকা। কিন্তু বর্তমানে বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায়। সংরক্ষণ করলেও অতিরিক্ত খরচের পাশাপাশি প্রতি মণে প্রায় ১০ কেজি পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় লোকসান আরও বেড়ে যাচ্ছে।
একই গ্রামের কৃষক আবুল মাতুব্বর বলেন, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। অন্যথায় অনেক কৃষক পেঁয়াজ চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন, যা দেশের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগজনক হয়ে উঠতে পারে।
শুধু সালথা নয়, ফরিদপুরের নগরকান্দা, বোয়ালমারী, ভাঙ্গা, সদরপুর ও মধুখালী উপজেলার পেঁয়াজচাষিরাও একই সংকটে রয়েছেন। অনেক কৃষক ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করলেও এখন সেই ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতেই হিমশিম খাচ্ছেন। তাদের দাবি, সরকারিভাবে পেঁয়াজ সংগ্রহ, আধুনিক সংরক্ষণাগার নির্মাণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ প্রদান এবং বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
ফরিদপুর শহরের শরীয়তউল্লাহ বাজারের আড়তদার শাহজাহান বেপারি বলেন, এ বছর পেঁয়াজের উৎপাদন ভালো হওয়ায় বাজারে সরবরাহ বেড়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই দাম কমে গেছে। তবে কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
সালথা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে পেঁয়াজ আবাদ হয়েছে। কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী প্রতি কেজি পেঁয়াজ উৎপাদনে গড়ে প্রায় ২৪ টাকা এবং প্রতি মণে প্রায় ৯৬০ টাকা খরচ হয়। তবে বাজারদর নির্ধারণ কৃষি বিভাগের দায়িত্ব নয়। কৃষকদের উন্নত সংরক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দবির উদ্দিন বলেন, কৃষকরা ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় যে সংকটে রয়েছেন, সে বিষয়ে প্রশাসন অবগত। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরা হবে।
ফরিদপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শাহাদুজ্জামান জানান, জেলায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে পেঁয়াজ আবাদ হয়েছে। সংরক্ষণ সুবিধা বাড়াতে ইতোমধ্যে হাজার হাজার এয়ারফ্লো মেশিন বিতরণ করা হয়েছে এবং আরও মেশিন সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিশ্চিত হলে কৃষকরা কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হবেন না।

