টানা সাত দিনের প্রবল বর্ষণে সৃষ্ট বন্যা ও পাহাড় ধসে কক্সবাজারের চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলায় ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। পানিবন্দি অবস্থায় চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন প্রায় দুই লক্ষাধিক মানুষ। গত ৫ জুলাই থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত বন্যার পানিতে ডুবে এবং পাহাড় ধসে অন্তত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।
সর্বশেষ শুক্রবার দুপুরে চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নে বসতবাড়ি পানিতে তলিয়ে যাওয়ার পর নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে রসুলাবাদ এলাকার আবদুল মালেকের ১২ বছর বয়সী মেয়ে হাসনাতুল জান্নাত ঝর্ণার মৃত্যু হয়। একই ঘটনায় তার দুই বোনকে জীবিত উদ্ধার করে চিকিৎসা শেষে বাড়ি পাঠানো হয়েছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেলে চকরিয়া উপজেলার কাকারা ইউনিয়নের মাইজ কাকারা এলাকায় পানিতে ডুবে দুই বছর বয়সী মোহাম্মদ ওয়াকিমের মৃত্যু হয়। একইদিন সকালে মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের চরপাড়া এলাকায় বন্যার পানিতে ভেসে গিয়ে প্রাণ হারায় তিন বছর বয়সী পুষ্পর। এছাড়া বৃহস্পতিবার ভোরে চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নের মছনিয়াকাটা এলাকায় পাহাড় ধসে বসতঘরের ওপর মাটি চাপা পড়ে তওসিফ মিয়া (১৩) ও রুমি আক্তার (১৭) নামে এক পরিবারের দুই শিশুর মৃত্যু হয়।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় জেলার ১০টি উপজেলার ৪০টি ইউনিয়নের অন্তত ২০০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়া উপজেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নূরুল ইসলাম জানান, বান্দরবান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়ার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার বলেন, দুই উপজেলায় ৯৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নেওয়া দুর্গত মানুষের জন্য শুকনো খাবারসহ জরুরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত এবং দ্রুত পানি নিষ্কাশনের লক্ষ্যে স্লুইস গেট সচল রাখতে প্রশাসন সার্বক্ষণিক কাজ করছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আজাদ রহমান জানান, শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সরকারি হিসাবে কক্সবাজার জেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৬২ জন। এর মধ্যে ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ১৪ হাজার ৬১ জন।
তিনি আরও জানান, দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারিভাবে ২০০ টন চাল, ৪৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ত্রাণ বিতরণ ও জরুরি সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে।
এদিকে কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ মোহাম্মদ আবদুল হান্নান জানিয়েছেন, গত ছয় দিনে জেলায় ৭০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী দুই দিন মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এতে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি এবং নতুন করে পাহাড় ধসের আশঙ্কা রয়েছে।

