পানির নিচে নিখোঁজ মানুষের সন্ধান বের করাই ছিল যার পেশাগত দায়িত্ব, সেই ফায়ার সার্ভিসের দক্ষ ডুবুরি সাদিক (২৬) এবার আর নিজে ফিরে এলেন না। শীতলক্ষ্যা নদীতে দায়িত্ব পালনকালে পানিতে নিখোঁজ হওয়ার প্রায় আট ঘণ্টা পর উদ্ধার করা হয় তার মরদেহ।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) দুপুরে নারায়ণগঞ্জ শহরের নিতাইগঞ্জ ফায়ার ঘাট এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীতে জমে থাকা কচুরিপানা অপসারণের কাজ চলছিল। এ সময় নারায়ণগঞ্জ নদী ফায়ার স্টেশনের তিন সদস্য দায়িত্ব পালন করছিলেন। স্পিডবোটের সামনের অংশে অবস্থান নিয়ে কাজ করছিলেন ডুবুরি সাদিক।
হঠাৎ নদীর ঢেউয়ে ভারসাম্য হারিয়ে তিনি পানিতে পড়ে যান এবং মুহূর্তের মধ্যে নিখোঁজ হয়ে যান। পরে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল উদ্ধার অভিযান শুরু করে। দীর্ঘ প্রায় আট ঘণ্টার চেষ্টার পর সন্ধ্যা ৭টার দিকে দুর্ঘটনাস্থলের অদূরে কেরোসিন ঘাট এলাকা থেকে তার নিথর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে মরদেহ নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফিন জানান, জেটির সামনে জমে থাকা কচুরিপানা পরিষ্কারের কাজ চলাকালে সাদিক ঢেউয়ের ধাক্কায় নদীতে পড়ে যান। সঙ্গে থাকা দুই সদস্যের ভাষ্যমতে, পড়ে যাওয়ার সময় তার মাথায় আঘাত লেগে থাকতে পারে। কারণ তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রশিক্ষিত ও দক্ষ ডুবুরি।
মৃত্যুর খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে আসেন তার স্ত্রী সাদিয়া, পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা। মর্গের সামনে প্রিয়জনের নিথর দেহ দেখে তারা কান্নায় ভেঙে পড়েন।
২০০১ সালের ১০ অক্টোবর রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার কুমরাকান্দি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সাদিক। ২০২১ সালের ২৪ অক্টোবর ফায়ার সার্ভিসে যোগ দিয়ে ২০২২ সালের ৮ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ নদী ফায়ার স্টেশনে পদায়ন পান। অল্প সময়েই সাহস, দক্ষতা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে সহকর্মীদের আস্থা অর্জন করেন তিনি।
সহকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পানিতে ডুবে যাওয়া ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার, নদীতে নিখোঁজ মানুষের সন্ধান এবং বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ধার অভিযানে তিনি সব সময় সামনের সারিতে থাকতেন। সম্প্রতি সিদ্ধিরগঞ্জের একটি লেকে নিখোঁজ তিনজনের মরদেহ উদ্ধারের অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। দায়িত্বশীলতা ও সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ গত বছর তিনি ‘সেরা ডুবুরি’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ও পদক লাভ করেন।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, চার ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয় ছিলেন সাদিক এবং পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিয়ে করে স্ত্রীকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জ শহরের ডালপট্টি এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করেন।
ঘটনার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহিদ কামাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান এবং ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

