ফরিদপুরের সালথা উপজেলার আটঘর গ্রামের সোহেলের সংসার চলে অন্যের গরু রাখার জন্য তৈরি ছোট্ট একটি গোয়ালঘরে। নিজের নামে এক শতাংশ জমিও নেই তাঁর। মাথা গোঁজার মতো স্থায়ী কোনো ঠিকানা না থাকায় স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ওই স্যাঁতসেঁতে ঘরেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি।
শুক্রবার বিকেলে আটঘর গ্রামে সোহেলের বসতঘরে গিয়ে দেখা যায়, গরু রাখার জন্য নির্মিত ছোট্ট ঘরটিই এখন তাঁদের সংসারের একমাত্র আশ্রয়। ঘরের এক পাশে সামান্য কিছু গৃহস্থালি সামগ্রী, অন্য পাশে স্ত্রী ও সন্তানদের থাকার ব্যবস্থা। স্বাভাবিক জীবনযাপনের ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধাও নেই সেখানে।
সোহেল নিজেও শারীরিকভাবে অসুস্থ। অসুস্থতার কারণে নিয়মিত কাজ করতে পারেন না। ফলে সংসারে নেই স্থায়ী কোনো আয়। এর মধ্যে তাঁর স্ত্রীও দুই কিডনি নষ্ট হয়ে দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। একসময় ভিক্ষা করে সংসারে সামান্য সহযোগিতা করলেও শারীরিক অসুস্থতার কারণে এখন সেটিও করতে পারেন না।
চিকিৎসার ব্যয়, খাবারের সংস্থান ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ—সব মিলিয়ে প্রতিনিয়ত কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দিন কাটছে পরিবারটির। কখনো খাবার জোটে, আবার কখনো জোটে না। অসুস্থ শরীর নিয়ে সোহেলের পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়, আবার চিকিৎসার খরচ বহন করার সামর্থ্যও নেই।
দারিদ্র্যের প্রভাব পড়েছে তাঁদের সন্তানদের জীবনেও। ১৩ বছর বয়সী বড় ছেলে একসময় পড়াশোনা করলেও সংসারের অভাবের কারণে তাকে স্কুল ছাড়তে হয়েছে। এখন সে একটি দোকানে কাজ করে সংসারে সহযোগিতা করছে। অথচ এই বয়সে তার হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, কাঁধে স্কুলব্যাগ।
সোহেলের সাত বছর বয়সী ছোট ছেলে এখনো প্রথম শ্রেণিতে পড়ছে। নানা সংকটের মধ্যেও সে নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। পরিবারের সদস্যদের আশা, অন্তত ছোট ছেলেটির পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি রাজিয়া বেগম বলেন, পরিবারটির জন্য সবার আগে একটি স্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এগিয়ে এলে তাঁরা নিরাপদে থাকার একটি ঠিকানা পেতে পারেন।
স্থানীয় বাসিন্দা রবিউল মাতুব্বর বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পরিবারটির এমন দুরবস্থা দেখে আসছেন তাঁরা। সোহেল ও তাঁর স্ত্রীর চিকিৎসার পাশাপাশি তাঁদের জন্য একটি ঘর খুবই জরুরি। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ এগিয়ে এলে পরিবারটির কষ্ট অনেকটাই কমতে পারে।
পরিবারটির দুর্দশার খবর পেয়ে শুক্রবার বিকেলে সরেজমিনে তাঁদের পাশে দাঁড়াতে ছুটে যান সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দবির উদ্দিন। তিনি সোহেলের গোয়ালঘরসদৃশ বসতঘরে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁদের জীবনযাপনের বাস্তব চিত্র দেখেন।
পরিবারটির অবস্থা দেখে ইউএনও দবির উদ্দিন বলেন, ‘পরিবারটির অবস্থা অত্যন্ত মানবেতর। তাদের মাথা গোঁজার মতো কোনো ঘর নেই, আবার আয়েরও কোনো ব্যবস্থা নেই।’
তিনি জানান, সালথা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সোহেলের পরিবারের জন্য একটি ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি তাঁদের জীবিকা নির্বাহের জন্য একটি দোকানের ব্যবস্থা করে দেওয়ারও চেষ্টা করা হবে।
ইউএনও বলেন, একটি ঘর হয়তো খুব বড় কিছু নয়, একটি ছোট দোকানও হয়তো পুরো জীবনের সব সমস্যা দূর করতে পারবে না। তবে সোহেলের পরিবারের জন্য এই উদ্যোগ নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখাতে পারে।

