কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে হত্যার ঘটনায় সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯), মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৫) ও মো. কামরুল হাসানকে (১৬) জিজ্ঞাসাবাদের পর তাদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, অপ্রতিমের কাছে থাকা আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল তুহিন। পরে তার সঙ্গে ফাহাদ ও কামরুল যুক্ত হয়।
অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পরদিন তুহিনকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। তখনও তদন্তকারীরা জানতেন না, অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের খবর পায় পুলিশ।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, শুরুতে তুহিন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর শনিবার রাত ৮টার দিকে সে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে বলে দাবি পুলিশের। তবে প্রথমে সহযোগীদের নাম জানাতে চাইছিল না।
এ সময় তুহিনের মোবাইল ফোনে বারবার কল আসছিল। কলগুলো করছিল অপ্রতিমের বাবার মোবাইল সরঞ্জামাদি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ডেলিভারিম্যান মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৫)। বিষয়টি তদন্তকারীদের নজরে এলে ফাহাদকেও হেফাজতে নেওয়া হয়। পরে তুহিনের কাছ থেকে মো. কামরুল হাসানের (১৬) নাম পাওয়া যায় এবং তাকেও হেফাজতে নেয় পুলিশ। তিনজনকে একসঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদের পর হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তুহিনই পরিকল্পনা করে এবং ঘটনার দিন ফাহাদ ও কামরুলকে ডেকে নেয়। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তুহিন বাঁশ দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করে। পরে ফাহাদ ও কামরুলও তাকে আঘাত করে। একপর্যায়ে অপ্রতিমের মৃত্যু হয় বলে পুলিশের দাবি।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা আরও জানান, হত্যাকাণ্ডের পর তুহিন তার সমবয়সী বন্ধু সিয়ামকে (১৯) ঘটনার কথা জানায়। পরবর্তী সময়ে তুহিন, ফাহাদ, কামরুল ও সিয়ামকে হত্যা মামলার আসামি করা হয়েছে।
পুলিশ বলছে, তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দিও দিয়েছে। তাদের জবানবন্দি অনুযায়ী, অপ্রতিমের ১৭ প্রো ম্যাক্স মডেলের আইফোন ছিনিয়ে নেওয়াই ছিল হত্যাকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য। অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারও মনে করছেন, ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই তার ছেলেকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।
অপ্রতিমের বাবার কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট মার্কেটে মোবাইল সরঞ্জামাদির শোরুম রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নাম ‘ইয়েসটেক’। অপ্রতিমদের গন্ধমতি, কোটবাড়ির বাসা এবং তার মা ড. নাহিদা বেগমের কর্মস্থল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় কাছাকাছি এলাকায়। অন্যদিকে ফাহাদের বাসাও একই এলাকার কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের সালমানপুর (মেম্বার বাড়ি) এলাকায়।
ফাহাদের বাবা মমিন হোসেন পেশায় অটোচালক। বাবা-মায়ের অনুরোধে চলতি মাসের ২ সেপ্টেম্বর অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে ডেলিভারিম্যান হিসেবে ফাহাদ চাকরিতে যোগ দেয়। মাত্র ১৬ দিন আগে চাকরিতে যোগ দিলেও তার সঙ্গে তখনও কোনো চুক্তিপত্র হয়নি বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, তুহিনের বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। মোটরসাইকেল বিক্রি বা ছিনতাইয়ের কথা বলে ক্রেতাকে ডেকে জিম্মি করে টাকা লুটের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। নীরব নামে এক বন্ধুর সঙ্গে তুহিনের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে বলেও স্থানীয়রা জানান। অপ্রতিমও তাদের কাছ থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে চালাত বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।
তুহিন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন সালমানপুর সানন্দা এলাকার নুরে আলমের ছেলে। স্থানীয়দের কেউ কেউ তাকে ‘পাওয়ারফুল’ বলে দাবি করলেও তার কথিত প্রভাবের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
পুলিশের ভাষ্য, হত্যায় জড়িত চারজনই অনিয়মিত বা ঝরে পড়া শিক্ষার্থী এবং তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের বখাটেপনার অভিযোগ রয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা ও ঘটনার বিস্তারিত বিষয় তদন্তের মাধ্যমে আরও যাচাই করা হচ্ছে।

