আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষীর জেরা চলাকালে প্রসিকিউশনের এক সদস্যের ‘জেন-জি ক্ষেপে গেলে বিপদ আছে’ মন্তব্যকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। মন্তব্যটিকে হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে আপত্তি জানান আসামিপক্ষের আইনজীবী। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উভয় পক্ষকে শান্ত ও সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
রোববার (৮ নভেম্বর) ট্রাইব্যুনাল-১-এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ১৩ নম্বর সাক্ষীকে জেরা করার সময় এ ঘটনা ঘটে।
আসামিপক্ষে সাক্ষীকে জেরা করছিলেন আইনজীবী পলাশ চন্দ্র রায়। তাঁর সঙ্গে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরীসহ অন্য আইনজীবীরা। অন্যদিকে প্রসিকিউশনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর আবদুস সোবহান তরফদার, গাজী এমএইচ তামিম ও সহিদুল ইসলাম সরদারসহ অন্যরা।
জেরার একপর্যায়ে সাক্ষীর কাছে ২০২৪ সালে হাইকোর্টের একটি রায় সম্পর্কে জানতে চান আইনজীবী পলাশ চন্দ্র রায়। জবাবে সাক্ষী জানান, ওই রায়ের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে ২০২৪ সালের ৯ জুলাই অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের একটি প্রতিনিধিদল স্মারকলিপি দিয়েছিল কি না, তা তাঁর জানা নেই।
সাক্ষী আরও বলেন, একই দিনে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে একটি আবেদন করা হয়েছিল। তবে সেটি তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের ‘মনভোলানো কৌশল’ ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। পরে ওই মামলার শুনানির তারিখ জানতে চাইলে সাক্ষী জানান, তা তাঁর মনে নেই।
এ পর্যায়ে আরও কিছু প্রশ্ন করা হলে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়। তখন আসামিপক্ষের সারিতে বসা জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী বলেন, প্রসিকিউশনই জেরা করুক, তাঁরা বসে যাবেন।
এ সময় ট্রাইব্যুনাল তাঁকে ডায়াসে এসে কথা বলতে বলেন। মুনসুরুল হক অভিযোগ করেন, প্রসিকিউশনের কেউ দাঁড়িয়ে গেলে সাক্ষীর মনোযোগ অন্যদিকে চলে যায় এবং তিনি সতর্ক হয়ে ওঠেন। এতে সাক্ষীর কাছ থেকে সত্য বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। পরে ট্রাইব্যুনালের অনুমতি নিয়ে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইন পড়ে শোনান প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম।
আইন পড়া শেষ হলে আবার জেরা শুরু হয়। এ সময় কাঠগড়ায় বসা সাক্ষীকে উদ্দেশ করে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, প্রসিকিউশনের দিকে মুখ ফিরিয়ে জবাব দিতে। জবাবে সাক্ষী বলেন, ‘ঠিক আছে, তাহলে আমি সরে যাই।’ এরপর তিনি নিজের চেয়ার ঘুরিয়ে নেন।
সাক্ষীর এমন আচরণ দেখে প্রসিকিউশনের এক সদস্য মন্তব্য করেন, ‘জেন-জি ক্ষেপে গেলে বিপদ আছে।’ এ মন্তব্যে আপত্তি জানিয়ে আইনজীবী পলাশ চন্দ্র রায় বলেন, এটি এক ধরনের হুমকি। এমন পরিস্থিতিতে জেরা করা কঠিন।
এ নিয়ে উভয় পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে তীব্র বাগ্বিতণ্ডা শুরু হলে ট্রাইব্যুনাল হস্তক্ষেপ করেন। পরে দুই পক্ষকেই শান্ত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরিস্থিতি শান্ত হলে আইনজীবী পলাশ পুনরায় জেরা শুরু করেন।
চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের পাঁচটি অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল-১। এর আগে ২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর আদালত অভিযোগগুলো আমলে নেন।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলন দমনে মূল নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখেন সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হক। প্রথম অভিযোগে বলা হয়, ১৯ জুলাই ফোনালাপে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক আন্দোলনকারীদের কারফিউ জারির মাধ্যমে দমন করার কথা বলেন। তাঁদের প্ররোচনা ও ষড়যন্ত্রে বহু ছাত্র-জনতা প্রাণ হারালেও নির্যাতন বন্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
দ্বিতীয় অভিযোগে ২৩ জুলাই রাজধানীর মিরপুরে হত্যাকাণ্ডে তাঁদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ও উসকানির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তৃতীয় অভিযোগে ২৮ জুলাই মিরপুর-১০ নম্বরে মারণাস্ত্র ব্যবহারে প্ররোচনা ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়।
চতুর্থ অভিযোগে বলা হয়েছে, ৪ আগস্ট মিরপুর-১ এলাকায় কারফিউ ও মারণাস্ত্র ব্যবহারে উসকানির ঘটনায় ১২ জন নিহত হন। পঞ্চম অভিযোগে ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ব্যর্থ করার পরিকল্পনা এবং মিরপুর-২, ১০ ও ১৩ নম্বর এলাকায় ১৬ জনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।

