দেশে ভ্যাট ও কর ব্যবস্থাকে আধুনিকীকরণের মাধ্যমে টেকসই ডিজিটাল অর্থনীতি, স্মার্ট ই-কমার্স ও উদ্যোক্তাবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তোলা কঠিন কিছু হবে না।
বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রসারের কারণে অর্থনীতিতেও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা ব্যাপকভাবে চালু হচ্ছে। গত এক দশকে দেশের ই-কমার্স, এফ-কমার্স, স্মার্ট লজিস্টিকস এমনকি প্রযুক্তিনির্ভর ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এমএমই) খাতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রযুক্তি ও প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনার ব্যবহার বাড়ায় সাধারণ মানুষের জীবনেও পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘আইসিটি অ্যাপ্লিকেশন অ্যান্ড ইউজেজ সার্ভে’ অনুযায়ী, দেশের ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবারই মোবাইল ফোন সুবিধার আওতায় এসেছে। দেশের মোট জনসংখ্যার ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ সরাসরি ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। এ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে প্রায় ৭২ দশমিক ৪ শতাংশই প্রতিদিন সক্রিয়ভাবে অনলাইনে যুক্ত থাকেন। প্রযুক্তিগত সুবিধা ভোগের ক্ষেত্রে দেশের ৯৮ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় রয়েছেন। অর্থাৎ ডিজিটাল অবকাঠামো এবং বড় পরিসরে ডিজিটাল অর্থনীতি পরিচালনার সক্ষমতা আমাদের রয়েছে।
এ সক্ষমতার অবস্থা বোঝার জন্য দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি এবং বাজার পরিস্থিতি বোঝা জরুরি। বর্তমানে দেশে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাঁচ লাখেরও বেশি অনলাইন উদ্যোক্তা, কয়েক লাখ লজিস্টিকস কর্মী, ফ্রিল্যান্সার, মার্চেন্ট এবং প্রযুক্তিকর্মী ডিজিটাল কমার্স ইকোসিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইসিডিবি এবং পে নেক্সট থ্রি সিক্সটির বাজার বিশ্লেষণ বলছে, বাংলাদেশের বিজনেস টু কনজিউমার (বিটুসি) ই-কমার্স বাজারের আকার এরই মধ্যে ৭০০ কোটি ডলারের বেশি। খাতটির বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ১২-১৮ শতাংশ। আগামী পাঁচ বছরে এ বাজার দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিটিআরসির তথ্য বলছে, দেশে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২০ কোটিরও বেশি। প্রতিদিন এ মাধ্যমে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়। এ ধরনের লেনদেন এত জনপ্রিয় হয়েছে যে কিউআর কোডভিত্তিক ডিজিটাল মার্চেন্ট ইকোসিস্টেমে ১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি মার্চেন্ট যুক্ত হয়েছে।
তবে ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের এখনো অনেক সংকট রয়েছে। জটিল ভ্যাট ও কর কাঠামো, উচ্চ পেমেন্ট গেটওয়ে চার্জ, এমএফএস মার্চেন্ট ফি, লজিস্টিকস খরচ স্থিতিশীল না থাকা এবং নানা সুবিধার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা রয়েছে। বিবিএসের তথ্যই বলছে, উচ্চ গতিসম্পন্ন ইন্টারনেট ব্যবহার বাড়ার পরও গত তিন মাসে মাত্র ১১ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ অনলাইনে কেনাকাটা করেছেন। তবে এ খাতে গতি আনার জন্য সরকার এরই মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছে। যেমন তথ্যপ্রযুক্তি ও উদ্যোক্তা খাতে কর অবকাশ সুবিধা রয়েছে। ক্যাশলেস পেমেন্ট ইকোসিস্টেমের সম্প্রসারণ ঘটেছে। এসএমই ও নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তা দেয়া হচ্ছে। ডিজিটাল ভ্যাট ব্যবস্থাও চালু হয়েছে। অবশ্য এ খাতের মূল সমস্যা এখনো কাঠামোগত। জটিল কর ও ভ্যাট ব্যবস্থাপনাই এখানে জটিলতা তৈরি করছে। অটোমেশন পদ্ধতিও অসম্পূর্ণ। এখনো ম্যানুয়াল ডকুমেন্ট, অফিস ভিজিট, প্রশাসনিক যোগাযোগের ওপর এ বিষয়গুলো নির্ভর করছে। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের তুলনায় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিযোগিতাও অসম।
এ খাতের উন্নয়নের জন্য অবশ্য কয়েকটি নীতিগত প্রস্তাব রয়েছে। ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য পৃথক কর কাঠামো দরকার। ভ্যাট ব্যবস্থা সহজ করতে হবে। এক্ষেত্রে ম্যানুয়াল বা কাগজের ওপর নির্ভরশীলতা একেবারে কমিয়ে আনতে হবে। ওয়ান স্টপ ডিজিটাল বিজনেস রেজিস্ট্রেশন চালু করা জরুরি। এমডিআর ও ট্রানজেকশন ফি কমিয়ে আনা জরুরি। ক্রস বর্ডার ও ই-কমার্স কাঠামো তৈরি করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর স্টার্টআপের ক্ষেত্রে কর সপ্তাহ চালু করা যেতে পারে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য খাতভিত্তিক বিশেষ প্রণোদনা নিশ্চিত করতে হবে। তথ্যের স্বচ্ছতার জন্য ডিজিটাল কমার্স ডেটা সেন্টার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সম্পূর্ণ ব্যবস্থাকে উন্নত করার জন্য জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে।

