চট্টগ্রামের হাটহাজারী ফিল্ড ফায়ারিং রেঞ্জে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ চলাকালে ট্যাংক থেকে গোলাবর্ষণের সময় দুর্ঘটনায় নিহত সেনাসদস্য আবু বকর সিদ্দিক পিয়াসের জানাজা ও দাফন নোয়াখালীর কবিরহাটে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্পন্ন হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) দুপুর সোয়া ১২টার দিকে কবিরহাট উপজেলার সুন্দলপুর ইউনিয়নের মালিপাড়া গ্রামের মুন্সী সর্দার বাড়ির সামনে পিয়াসের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে তাকে সামরিক মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। পরে নিজ গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে দাদা-দাদির কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।
এর আগে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে পিয়াসের মরদেহ মাইজদী শহীদ বুলু স্টেডিয়ামে আনা হয়। সেখান থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহ নেওয়া হয় তার গ্রামের বাড়িতে। পরিবারের সদস্যরা শেষবারের মতো তাকে দেখার পর জানাজার জন্য মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়।
পিয়াসের জানাজায় পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সেনাবাহিনীর সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার কয়েক হাজার মানুষ অংশ নেন। স্বজনদের কান্না ও আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ।
নিহত আবু বকর সিদ্দিক পিয়াস কবিরহাট উপজেলার সুন্দলপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মালিপাড়া গ্রামের আব্দুল ওয়াহাবের ছেলে। চার বোনের একমাত্র ভাই ছিলেন তিনি। স্বজনেরা জানান, ছোটবেলা থেকেই শান্ত, ভদ্র ও অমায়িক স্বভাবের পিয়াস সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন। সহজ-সরল ব্যবহারের কারণে পরিবার ও প্রতিবেশীদের কাছেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রিয়।
২০১৮ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন পিয়াস। ২০২৩ সালে বিয়ে করেন তিনি। স্ত্রী ও ১৮ মাস বয়সী কন্যাসন্তানকে নিয়ে চট্টগ্রামের সেনা কোয়ার্টারে বসবাস করতেন। প্রশিক্ষণ মাঠে আকস্মিক দুর্ঘটনায় পিয়াসসহ দুই সেনাসদস্য নিহত হন। এ ঘটনায় এক সেনা কর্মকর্তা গুরুতর আহত হয়ে ঢাকার সিএমএইচে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানিয়েছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)।
পিয়াসের মৃত্যুতে সবচেয়ে বেশি ভেঙে পড়েছেন তার বাবা-মা ও স্ত্রী। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে বাবা আব্দুল ওয়াহাব কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। স্বামীকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ স্ত্রীও। মাত্র ১৮ মাস বয়সী মেয়েটি এখন বাবার স্মৃতি নিয়েই বড় হবে।
স্বজনেরা জানান, পরিবারের জন্য একটি পাকা ঘর নির্মাণের স্বপ্ন ছিল পিয়াসের। মা-বাবা, স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে সুন্দর একটি ঘরে থাকার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই দেশের সেবায় নিয়োজিত অবস্থায় তাকে চলে যেতে হলো না ফেরার দেশে।
পিয়াসের বন্ধু আকরাম বলেন, পিয়াস শুধু তার বন্ধু ছিলেন না, ভাইয়ের মতো ছিলেন। সবসময় হাসিমুখে থাকতেন এবং কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতেন না। দেশের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এভাবে চলে যাওয়ার বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তিনি।
পিয়াসের চাচাতো ভাই হারুন বলেন, চার বোনের একমাত্র ভাই হওয়ায় পরিবারের সবার কাছেই পিয়াস ছিলেন অত্যন্ত আদরের। স্ত্রী-সন্তান ও মা-বাবাকে ভালোভাবে রাখার জন্য তার অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু এত অল্প বয়সে এভাবে চলে যাবেন, তা কেউ কল্পনাও করেননি।
পিয়াসের ভগ্নিপতি আবু সাঈদও তার শান্ত ও সহজ-সরল স্বভাবের কথা স্মরণ করেন। তার অমায়িক ব্যবহারের কারণে তিনি সবার কাছে প্রিয় ছিলেন বলে জানান স্বজনেরা।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে পিয়াসের পরিবার। স্ত্রী, ছোট্ট সন্তান, মা-বাবা ও স্বজনদের জীবনে নেমে এসেছে গভীর শূন্যতা।
পিয়াসের বাবা আব্দুল ওয়াহাব বলেন, ছেলের অনেক স্বপ্ন ছিল। সংসারের কষ্ট দূর করার পাশাপাশি পাকা ঘর নির্মাণের স্বপ্নও ছিল তার। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই ছেলের লাশ কাঁধে নিতে হয়েছে বাবাকে। এখন সেই ঘর হলেও কী হবে—ছেলেটিই তো আর নেই।

