সেনেগালের ছোট্ট গ্রাম বাম্বালির মানুষের জন্য সাদিও মানের ভালোবাসা নতুন নয়। ক্যারিয়ারে উপার্জিত অর্থের বড় একটি অংশ নিজের জন্মভূমির মানুষের কল্যাণে ব্যয় করেছেন সেনেগালের এই ফুটবল তারকা। মসজিদ, স্কুল, হাসপাতাল, পেট্রোল স্টেশন ও বেকারি নির্মাণের পর এবার গ্রামটির অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্ত করতে বড় ধরনের কৃষিভিত্তিক শিল্প প্রকল্পে বিনিয়োগ করছেন তিনি।
৩৪ বছর বয়সী মানে নিজের অর্থে প্রায় ১১ দশমিক ৭ বিলিয়ন সিএফএ ফ্রাঁ, অর্থাৎ প্রায় ২ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করছেন ‘এসএম১০ অ্যাগ্রো’ নামের প্রকল্পে। এর মাধ্যমে বাম্বালির আম উৎপাদনকে বাণিজ্যিক ও শিল্পভিত্তিক কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
গত ১৯ সেপ্টেম্বর বাম্বালিতে প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন মানে। প্রায় ৫০০ হেক্টর জমির ওপর নির্মিত হবে এই অ্যাগ্রো-ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক। প্রকল্পটির পুরো অর্থায়ন নিজেই করছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
‘বিজনেস ইনসাইডার আফ্রিকা’র তথ্য অনুযায়ী, ফুটবলের বাইরে এটি মানের অন্যতম বড় বিনিয়োগ। প্রকল্পটি সম্পন্ন হতে সময় লাগবে প্রায় ১৮ মাস। এখানে চারটি প্রক্রিয়াজাতকরণ ইউনিট, একটি কৃষি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও গবেষণার ব্যবস্থা থাকবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেখানে প্রায় ৭৮ হাজার আমগাছ লাগানো হবে। প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হলে এক হাজারের বেশি মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। বছরে প্রায় ৮ হাজার ৫০০ টন আম প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা থাকবে এসএম১০ অ্যাগ্রোর। নতুন বাগান থেকে প্রথম ফলন পেতে সময় লাগবে প্রায় তিন বছর।
বাম্বালি ও আশপাশের এলাকায় বিপুল পরিমাণ আম উৎপাদন হলেও সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফল নষ্ট হয়ে যায়। পর্যাপ্ত ক্রেতার অভাবও স্থানীয় কৃষকদের জন্য বড় সমস্যা।
এসএম১০ অ্যাগ্রোতে শুধু তাজা আম বিক্রি বা রপ্তানি করা হবে না। আম থেকে পাল্প, শুকনো আম ও আমের মাখন তৈরি করা হবে। পাশাপাশি পেয়ারা প্রক্রিয়াজাতেরও পরিকল্পনা রয়েছে। এসব পণ্য সেনেগালের অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি আফ্রিকা, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানির লক্ষ্য রয়েছে।
মানে বলেন, ‘আমি চাই, এই জমির ফল এখানেই মানুষের কাজে লাগুক।’
গত এক দশকে বাম্বালিতে মানের বিভিন্ন মানবিক উদ্যোগ প্রশংসা পেয়েছে। নিজের অর্থে সেখানে মসজিদ, স্কুল ও হাসপাতাল নির্মাণে সহায়তা করেছেন তিনি। গ্রামের মানুষের জন্য বিনামূল্যে ইন্টারনেট সুবিধাও চালু করেছেন এবং নিয়মিত আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছেন। গত বছরের নভেম্বরে সেখানে একটি বেকারিও চালু করেন তিনি।
তবে এসএম১০ অ্যাগ্রো আগের উদ্যোগগুলোর চেয়ে ভিন্ন। এবার শুধু সহায়তা দেওয়ার পরিবর্তে স্থানীয় সম্পদ ও কৃষিকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলাই মানের লক্ষ্য।
প্রকল্পটির মাধ্যমে দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়া আমকে প্রক্রিয়াজাত করে দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য পণ্যে রূপান্তর করা হবে। এতে কৃষকদের আয় বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় উৎপাদন আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের আশা, দ্বিতীয় বছর থেকেই এসএম১০ অ্যাগ্রো লাভজনক হতে পারে এবং বিনিয়োগের ওপর ১০০ শতাংশের বেশি রিটার্ন দিতে পারে।
ফুটবল মাঠে মানে যেমন সেনেগালের অন্যতম বড় তারকা, মাঠের বাইরেও তেমনি সামাজিক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে আলাদা পরিচয় তৈরি করেছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের কাছে ৩-২ গোলে হেরে সেনেগালের বিদায়ের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেন তিনি।
সেনেগালের হয়ে ৫৪ গোল করে দেশটির সর্বোচ্চ গোলদাতা মানে। জাতীয় দলের হয়ে ২৯টি অ্যাসিস্টও করেছেন তিনি, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ২০২২ সালের ব্যালন ডি’অর ভোটে দ্বিতীয় হয়েছিলেন এই তারকা। একই বছর সামাজিক কাজের স্বীকৃতি হিসেবে জিতেছিলেন সক্রেটিস পুরস্কার।
নিজের গ্রামের স্কুল, হাসপাতাল ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নের পর এবার এসএম১০ অ্যাগ্রোর মাধ্যমে বাম্বালির জন্য একটি উৎপাদনমুখী ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে চান মানে।

