নেত্রকোনার দুর্গাপুরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলীফ ফকির হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে ছায়াতদন্ত শুরু করেছে এসআরবি-১৪, ময়মনসিংহ। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সন্ধ্যায় যে স্থানে হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছিল, সেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এসআরবি-১৪, ময়মনসিংহের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. মাসুদ রানা এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাফিজুল ইসলাম।
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মো. মাসুদ রানা জানান, তাঁরা ছায়াতদন্তে নেমেছেন এবং ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করছেন।
এদিকে, হত্যাকাণ্ডের প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর নিহত সাংবাদিকের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা বাদী হয়ে দুর্গাপুর থানায় আটজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন। পোস্টমর্টেম (ময়নাতদন্ত) শেষে নিহতের মরদেহ তাঁর নিজ গ্রাম নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের শুনুই গ্রামে নিয়ে দাফন করা হয়েছে। স্বামী হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত খুঁজে বের করে আইনের আওতায় এনে ফাঁসির দাবি জানিয়েছেন স্ত্রী আনন্দিতা।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাত আনুমানিক ৮টার দিকে দুর্গাপুর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের তেলুঞ্জিয়া এলাকায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহত লুৎফুজ্জামান আলীফ ফকির ‘রূপসী বাংলা’ টেলিভিশনের নেত্রকোনা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন। পাশাপাশি তিনি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন, যেখানে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অপরাধের বিষয়ে ভিডিও প্রকাশ করা হতো।
নিহত আলীফ ফকির নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের শুনুই গ্রামের বাসিন্দা মহব্বত আলী ফকিরের ছেলে। তিনি স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে তেলুঞ্জিয়া এলাকায় বসবাস করতেন।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে এসআরবি-১৪ ময়মনসিংহের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. মাসুদ রানা সাংবাদিকদের বলেন, “এ হত্যাকাণ্ডের ছায়াতদন্ত শুরু হয়েছে। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হচ্ছে। প্রশাসন, গোয়েন্দা বিভাগ, এসআরবি-১৪ সহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মাঠে নেমে কাজ করছেন। ঘটনাস্থলে গুলির খোসা পড়ে থাকতে দেখা গেছে।”
তিনি হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত যেকোনো তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার জন্য সাংবাদিকসহ সর্বস্তরের মানুষের প্রতি আহ্বান জানান এবং তথ্য প্রদানের জন্য একটি হটলাইন নম্বর ঘোষণা করেন। পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে সাংবাদিকদের সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করেন।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঘটনার দিন রাত ৮টার দিকে আলীফ ফকির তেলুঞ্জিয়া এলাকার এক চায়ের দোকান মালিক রবিন রাংসার দোকানে আগে রেখে যাওয়া মুঠোফোন নিতে যান। এ সময় দুই যুবক তাঁকে লক্ষ্য করে পরপর কয়েকটি গুলি ছোড়ে। গুলির শব্দ শুনে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে দুর্বৃত্তরা দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। পরে সাংবাদিক আলীফকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
প্রত্যক্ষদর্শী চায়ের দোকানমালিক রবিন রাংসা জানান, ঘটনার আগে আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৫ বছর বয়সী দুই ব্যক্তি তাঁর দোকানে এসে সিগারেট কেনেন—যাঁদের একজন লুঙ্গি পরা এবং অন্যজন থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট পরা ছিলেন। এর আগে আলীফ ফকির তাঁর দোকানে একটি মুঠোফোন রেখে গিয়েছিলেন এবং সেটি নিতেই দোকানে আসেন। এরপর ওই দুই ব্যক্তি সিগারেট নিয়ে আলীফের পিছু নেন। কিছুক্ষণ পরই পরপর তিনটি গুলির শব্দ শুনতে পেয়ে তিনি আতঙ্কে দোকান থেকে বাড়ির ভেতরে চলে যান।
স্বামীকে হারিয়ে শোকাহত আনন্দিতা সাংমা বলেন, “আমার স্বামীকে যারা হত্যা করেছে, আমি তাদের ফাঁসি চাই। যারা আমার দুই বাচ্চাকে এতিম করেছে, তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় এনে ফাঁসি কার্যকর করা হোক, যাতে আর কোনো সন্ত্রাসী কাউকে এভাবে হত্যা করার সাহস না পায়।”
তিনি আরও জানান, ঘটনার সময় তিনি বাড়িতেই ছিলেন। স্বামীকে গুলি করা হয়েছে খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে তাঁকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেন। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
পরবর্তীতে ময়নাতদন্ত শেষে নিহত সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলীফ ফকিরের মরদেহ কলমাকান্দা উপজেলার শুনুই গ্রামে নিয়ে গিয়ে দাফন সম্পন্ন করা হয়। এ সময় স্বজন, সহকর্মী ও এলাকাবাসীর মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে।
দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমদ জানান, নিহত সাংবাদিকের মাথা, গলা, বুকসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে পাঁচটি গুলির আঘাত রয়েছে। ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। আজ নিহতের স্ত্রী বাদী হয়ে দুর্গাপুর থানায় আটজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন। এ ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশের বিশেষ অভিযান চলছে বলেও জানান তিনি।
স্ত্রী ও দুই সন্তানকে রেখে একজন সাংবাদিকের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে পরিবার, সহকর্মী ও স্থানীয় সংবাদকর্মীদের মাঝে গভীর শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ শুরু হয়েছে। নিহতের স্বজন ও সহকর্মীরা দ্রুত এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন, জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

