নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার অপরাধ জগতের বহুল আলোচিত নাম বদিউল আলম বদি ওরফে বদিউজ্জামান (৪৭)-কে হত্যা, বিস্ফোরক ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের মতো একাধিক গুরুতর মামলার আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করেছে দুর্গাপুর থানা-পুলিশ। সোমবার (২ অক্টোবর) রাত আনুমানিক ৯টার দিকে এক বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশি রেকর্ড অনুযায়ী, ২০০৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বদিউল আলম বদির বিরুদ্ধে দুর্গাপুর থানায় অন্তত ১৯টি মামলার দীর্ঘ খতিয়ান (পিসিপিআর) রয়েছে। তবে এবার তাঁর গ্রেপ্তার কেবল পুরোনো মামলার ওয়ারেন্ট বা অভিযোগের ভিত্তিতেই হয়নি, বরং চাঞ্চল্যকর সাংবাদিক আলিফ ফকির হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যেও তাঁর নাম জোরালোভাবে উঠে আসছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
স্থানীয় রাজনীতি ও চোরাচালানসহ নানাবিধ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। বদিউল আলম বদি দুর্গাপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও কুল্লাগড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়ালের ছোট ভাই। অন্যদিকে, তিনি সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির ওরফে আলিফ ফকির হত্যাকাণ্ডের প্রধান সন্দেহভাজন আসামি এবং আলোচিত ‘শুটার শামীম’-এর ভাই। পারিবারিক পরিচয়ের আড়ালে গত দুই দশক ধরে এলাকায় অপরাধের এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তিনি পূর্ব থেকেই হত্যা ও সহিংসতার মতো একাধিক বড় মামলার জড়িত।
দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ বলেন, “তার বিরুদ্ধে বহু মামলার রেকর্ড রয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, সাম্প্রতিক সাংবাদিক আলিফ হত্যা মামলায় তিনি অস্ত্র ও অর্থের জোগানদাতা ছিলেন কি না, সে সম্পর্কিত প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ যাচাই করা হচ্ছে। আপাতত তাঁকে একটি অপহরণ মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে সোপর্দ করার প্রক্রিয়া চলছে। তবে রিমান্ডে এনে অধিকতর তদন্ত করা হলে এ হত্যা মামলার মূল রহস্য উন্মোচিত হবে। তাঁর বিরুদ্ধে মূলত হত্যা ও নাশকতার মতো বড় বড় অপরাধের অভিযোগই প্রধান।”
পুলিশের পূর্ববর্তী অপরাধের রেকর্ড (পিসিপিআর) পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০০৫ সালের ২ মে দুর্গাপুর থানায় দায়েরকৃত একটি হত্যা মামলার মাধ্যমে পুলিশের খাতায় প্রথম বড় ধরনের অপরাধী হিসেবে নাম ওঠে বদির। এরপর ২০১৫, ২০১৮, ২০২১, ২০২২, ২০২৩ এবং সর্বশেষ ২০২৪ সাল পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দায়ের হয়।
উল্লেখ্য, ২০০৫ সালের মে মাসে প্রথম হত্যা মামলার পর সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দায়েরকৃত আরেকটি হত্যা ও সহিংসতা মামলায় তাঁকে অভিযুক্ত করা হয়। এ মামলায় ২০২৫ সালের ১৫ মার্চ চার্জশিট এবং ২০ জুলাই সম্পূরক চার্জশিট ও নোটশিট প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দায়ের হওয়া বেশ কয়েকটি মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা, গুরুতর জখম ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে।
২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর এবং ২০২৩ সালের ১৮ জানুয়ারি, জুন ও নভেম্বর মাসে দায়েরকৃত একাধিক বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলায় তাঁর নাম রয়েছে, যার প্রায় সবকটিতেই পুলিশি তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। ২০১৮ সালের ১১ ডিসেম্বর এবং ২০২২ সালের ৩০ অক্টোবর বিশেষ ক্ষমতা আইনে দায়ের হওয়া দুটি পৃথক মামলার এজাহারভুক্ত আসামি তিনি। পাশাপাশি ২০২৩ সালের ২৯ মার্চ সরকারি কাজে বাধা ও সরকারি কর্মচারীকে আঘাতের অভিযোগে দায়েরকৃত মামলাতেও পুলিশ তদন্ত শেষে ২০২৪ সালের ১৫ জুন তাঁর বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করে।
বিগত দুই দশকে ১৯টি মামলার রেকর্ড এবং অধিকাংশ মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামি হওয়ার পরও দীর্ঘদিন অধরা থাকায় স্থানীয় সচেতন মহলে নানা প্রশ্ন বিরাজ করছিল। বিশেষ করে সাংবাদিক আলিফ ফকিরের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর থেকে অপরাধীদের শিকড় উপড়ে ফেলার দাবি জোরালো হয়ে ওঠে দুর্গাপুরবাসীর মধ্যে। বদির গ্রেপ্তারের খবরে একদিকে যেমন এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মাঝে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে।
স্থানীয়দের দাবি ও প্রত্যাশা—কেবল গ্রেপ্তারেই সীমাবদ্ধ না থেকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সাংবাদিক হত্যাসহ সব অপরাধের প্রকৃত আসামি এবং অস্ত্র ও অর্থের জোগানদাতাদের উপযুক্ত বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। একই সাথে বহু মামলার আসামি এবং এ সাংবাদিক হত্যা মামলার অন্যতম প্রধান আসামি ‘কিলার তাজুল’-কেও দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তাঁরা।

