জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাককানইবি) সম্প্রতি প্রকাশিত শিক্ষক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে বিভাগভেদে অসমান, অস্বাভাবিক ও অতিরিক্ত সিজিপিএ (CGPA) শর্তারোপ করা নিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রাক্তন ব্যাচগুলোর মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) কর্তৃক নির্ধারিত সার্বজনীন নীতিমালা তোয়াক্কা না করে মনগড়া রিকোয়ারমেন্ট সেট করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠে এসেছে।
গত ২৬ অক্টোবর তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার স্বাক্ষরিত একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে বিভিন্ন বিভাগে প্রভাষক পদে আবেদনের ন্যূনতম যোগ্যতা হিসেবে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে আলাদা আলাদা সিজিপিএ চাওয়া হয়। বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায়, পরিসংখ্যান, সমাজবিজ্ঞান ও অন্যান্য কিছু বিভাগে ৩.৫০ চাওয়া হলেও নৃবিজ্ঞান বিভাগে ৩.৬০ এবং বিপণন (মার্কেটিং) ও ব্যবস্থাপনা (ম্যানেজমেন্ট) বিভাগে অস্বাভাবিকভাবে ৩.৭৫ সিজিপিএ নির্ধারণ করা হয়েছে। যেখানে ইউজিসির সার্বজনীন নীতিমালায় সাধারণত ন্যূনতম ৩.৫০ সিজিপিএকে প্রমিত ধরা হয়, সেখানে এই ধরনের অতিরিক্ত যোগ্যতা নির্ধারণকে বৈষম্যমূলক বলছেন চাকরিপ্রার্থীরা।
প্রতিষ্ঠার প্রায় দুই দশক পার হতে যাওয়া এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, যেসব বিভাগে ৩.৭০ বা ৩.৭৫ সিজিপিএ চাওয়া হয়েছে, সেগুলোর অনেক ব্যাচে এযাবৎ একজন শিক্ষার্থীও এই পরিমাণ সিজিপিএ অর্জন করতে পারেননি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব যোগ্য সাবেক শিক্ষার্থীরা নিজ প্রতিষ্ঠানেই আবেদনের ন্যূনতম সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সাবেক শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বহিরাগত পছন্দের কোনো বিশেষ প্রার্থীকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়া কিংবা দুর্নীতি ঢাকতেই প্রশাসন কৌশল করে এই ‘হাই রিকোয়ারমেন্ট’ নির্ধারণ করেছে।
সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন পোস্ট ও সাবেক শিক্ষার্থীদের দাবি অনুযায়ী, এই বিজ্ঞপ্তিতে যে উচ্চমানের শর্তাবলী জুড়ে দেওয়া হয়েছে, তা যদি বর্তমান কর্মরত শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হয়, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ শিক্ষকই নিয়োগ পাওয়ার ন্যূনতম ক্রাইটেরিয়া পূরণ করবেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানসহ দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষক নিয়োগে এমন উচ্চ সিজিপিএ চাওয়ার নজির নেই বলে জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান লাবণ্য।
এই বৈষম্যমূলক নিয়োগ শর্তের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও ডিপার্টমেন্টের শিক্ষকদের মধ্যে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ও দায় এড়ানোর প্রবণতা দেখা গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার জানান, “ডিপার্টমেন্টগুলো থেকে যেভাবে চাহিদা ও যোগ্যতা পাঠানো হয়েছে, সেভাবেই বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগের অনুমতি ছাড়া এতে পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।” অন্যদিকে উপাচার্যের কাছে সাবেক শিক্ষার্থীরা স্মারকলিপি ও আবেদন জানাতে গেলে তিনি দেখা না করে ডিপার্টমেন্টের শিক্ষকদের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেন। অথচ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বিভাগের শিক্ষকরা দাবি করেছেন, এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চপর্যায়ের নীতি নির্ধারণী বিষয় এবং প্রশাসনের ইচ্ছা অনুযায়ীই তারা চাহিদাপত্র পাঠিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ও বর্তমানে এক্সিম ব্যাংক এগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটির প্রভাষক নিত্যানন্দ চন্দ্র বর্মন বলেন, “কিছু কিছু ডিপার্টমেন্ট থেকে এমন বেশি রিকোয়ারমেন্ট দেয়া হয়েছে, যা উক্ত অনুষদের অধিভুক্ত ডিপার্টমেন্ট গুলোর বেশিরভাগ ব্যাচেই এই ধরনের সিজিপিএ ধারী একজন শিক্ষার্থীও নেই! কোন বিবেচনায় উনারা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে এই ধরনের উচ্চ শর্ত উল্লেখ করেছেন তা শিক্ষার্থীদের সামনে খোলাসা করা উচিত।”
এদিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রভাষক মইনুল রাকিব এ বিষয়ে ফেসবুকে মন্তব্য করে বলেন, “কেবল অধিক আবেদন পড়বে বা নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে আগে থেকেই উচ্চ সিজিপিএকে ‘মাস্ট রিকোয়ারমেন্ট’ হিসেবে সেট করা ভালো লক্ষণ নয়। নিয়োগ ব্যবস্থায় চরম লেভেলের প্রশ্নহীন ও নিরপেক্ষ ফেয়ার রিক্রুটমেন্ট পদ্ধতি থাকা জরুরি।”
ইতোমধ্যে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির যোগ্যতা পুনঃবিবেচনা ও সংশোধনের দাবি জানিয়ে ১১ জন সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী প্রশাসন বরাবর আবেদন করেছেন। শিক্ষার্থীরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, অবিলম্বে ইউজিসির সমন্বিত নীতিমালা মেনে সমতাভিত্তিক বিজ্ঞপ্তি পুনরায় প্রকাশ করা না হলে তারা কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের দিকে হাঁটবেন।

