ঢাকা শহর আজ যানজটের এক অসহনীয় অভিশাপে জর্জরিত। প্রতিদিন লাখো মানুষ সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রাস্তায় আটকে থেকে তাদের মূল্যবান সময়, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক সম্পদ হারাচ্ছেন। এই সংকটের অন্যতম প্রধান উৎস হলো রাজধানীর আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালগুলোতে অতিরিক্ত বাসের চাপ, ফিটনেসবিহীন লক্করঝক্কর গাড়ির ব্যাপক বিস্তার এবং যত্রতত্র পার্কিংয়ের চরম বিশৃঙ্খলা। সবশেষ তথ্য অনুসারে সরকার অবশেষে এই দীর্ঘদিনের গভীর সমস্যা মোকাবিলায় কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। তবে এই উদ্যোগ যদি সত্যিকার অর্থে দৃঢ়তার সঙ্গে বাস্তবায়িত না হয়, তাহলে ঢাকার যানজট শুধু অব্যাহতই থাকবে না, বরং আরও ভয়াবহ ও অসহনীয় রূপ ধারণ করবে। নগরবাসীর জীবনযাত্রা দিন দিন আরও কষ্টকর হয়ে উঠবে।
বিশ্বের বিভিন্ন শহর যানজট মোকাবিলায় সফলতার উজ্জ্বল উদাহরণ স্থাপন করেছে, যা থেকে ঢাকা অনেক কিছু শিখতে পারে। সিঙ্গাপুর তার কনজেশন প্রাইসিং সিস্টেমের মাধ্যমে শহরের কেন্দ্রস্থলে যানবাহন প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করে ট্রাফিক জ্যাম ব্যাপকভাবে কমিয়েছে। তারা ইলেকট্রনিক রোড প্রাইসিং ব্যবহার করে পিক আওয়ার্সে অতিরিক্ত চার্জ আরোপ করে সড়কে গাড়ির সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে এবং সেই রাজস্ব দিয়ে উন্নত পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। লন্ডন শহরে কনজেশন চার্জ চালু করার ফলে কেন্দ্রীয় এলাকায় যানবাহনের সংখ্যা ১৫ শতাংশেরও বেশি হ্রাস পেয়েছে। সেই অর্থ ব্যয় করে তারা বাস ও সাইকেল লেন উন্নয়ন করেছে। কলম্বিয়ার বোগোটা শহর পিক-অ্যান্ড-প্লেট সিস্টেম চালু করে গাড়ির সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি উন্নত বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) ব্যবস্থা গড়ে তুলে যানজট উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে। ব্রাজিলের কুরিতিবা শহর বিশ্বের প্রথম সফল বিআরটি ব্যবস্থা প্রবর্তন করে শহরের অধিকাংশ যাত্রীকে দক্ষ গণপরিবহনে নিয়ে এসেছে, যা আজও অনেক উন্নয়নশীল শহরের জন্য মডেল। জাপানের টোকিও উন্নত মেট্রো নেটওয়ার্ক, ট্রানজিট ওরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্ট (টিওডি) এবং কঠোর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে যানজটকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।
এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে ইন্টেলিজেন্ট ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এবং ব্যাপক সাবওয়ে নেটওয়ার্ক যানজট কমাতে সহায়ক হয়েছে। নিউইয়র্ক শহরে অতিরিক্ত টোল ট্যাক্স এবং উন্নত পাবলিক ট্রানজিট ব্যবস্থার সমন্বয়ে কেন্দ্রীয় ম্যানহাটান এলাকায় ট্রাফিক প্রবাহ উন্নত হয়েছে। চীনের বেইজিংয়ে গাড়ির নিবন্ধন সীমিতকরণ, অড-ইভেন নম্বর প্লেট সিস্টেম এবং বিশাল মেট্রো নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যানজট নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছে। ভারতের দিল্লিতে মেট্রোর ব্যাপক সম্প্রসারণ, বাস র্যাপিড ট্রানজিট এবং অড-ইভেন ফর্মুলা প্রয়োগ করে কিছুটা সাফল্য পাওয়া গেছে, যদিও পুরোপুরি সমাধান হয়নি। ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় ট্রান্সজাকার্তা বিআরটি সিস্টেম এবং ইলেকট্রনিক রোড প্রাইসিং চালু করে যানজট কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব আন্তর্জাতিক উদাহরণ প্রমাণ করে যে, শুধু অভিযান চালালেই চলবে না, ব্যাপক, সমন্বিত, প্রযুক্তিনির্ভর ও দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণ করতে হয়। ঢাকা যদি এসব মডেল থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজস্ব প্রেক্ষাপটে উপযোগী করে প্রয়োগ করে, তাহলে যানজট নিরসনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব।
এ ক্ষেত্রে ঢাকার চিত্র ভিন্ন। রাজধানীর গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদ-এই তিনটি প্রধান আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালের মোট ধারণক্ষমতা মাত্র ১২৫০টি বাসের। অথচ বাস্তবে সেখানে প্রায় ৪,৫০০ থেকে ৫,০০০টিরও বেশি বাস প্রতিদিন চলাচল করছে। গাবতলীতে ২৫০টির জায়গায় ৮০০ থেকে ১,০০০টি, মহাখালীতে ৩৫০টির পরিবর্তে ১,১০০ থেকে ১,২০০টি এবং সায়েদাবাদে ৬৫০টির বিপরীতে ২,০০০ থেকে ২,২০০টি বাস চলছে। এই অতিরিক্ত চাপ শুধু টার্মিনাল এলাকায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং পুরো ঢাকা শহরের যান চলাচল ব্যবস্থাকেই ধ্বংস করে দিচ্ছে। টার্মিনালের ভেতরে নির্ধারিত কাউন্টার ও পার্কিং এলাকা থাকা সত্ত্বেও বাসগুলোকে এলোমেলোভাবে মূল সড়কের ওপর রাখা হয়। যাত্রীরা প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সরাসরি রাস্তা থেকে বাসে উঠতে বাধ্য হচ্ছেন।
যাত্রী সংগ্রহের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় অবৈধ কাউন্টার গড়ে তোলা হয়েছে টার্মিনালের বাইরে বিভিন্ন স্থানে। ফলে সড়কের বড় অংশ দখল হয়ে যাচ্ছে, ট্রাফিক প্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে। ঢাকার ভেতরে গড়ে ওঠা আরও ১২ থেকে ১৫টির বেশি অবৈধ অস্থায়ী টার্মিনাল যেমন কল্যাণপুর, গুলিস্তান, মগবাজার, বাড্ডা, মিরপুর, উত্তরা ইত্যাদি এলাকায় পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও অব্যবস্থাপনাময় করে তুলেছে। ফিটনেসবিহীন পুরনো বাসগুলো শুধু যানজটই বাড়াচ্ছে না, বরং বায়ু দূষণ, শব্দদূষণ এবং যাত্রীদের জীবনহানির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব বাস থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া ঢাকার বায়ুকে আরও বিষাক্ত করে তুলছে, যা শিশু, বয়স্ক ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগীদের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক উদ্যোগকে অবশ্যই স্বাগত জানানো উচিত। অতিরিক্ত বাসের রুট পারমিট বাতিল, বিশেষ করে পুরনো, মেয়াদোত্তীর্ণ ও ফিটনেসবিহীন বাসগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ। বাস মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করে টার্মিনালগুলো থেকে অতিরিক্ত বাস সরিয়ে দেওয়া এবং ধারণক্ষমতার মধ্যে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে টার্মিনাল এলাকায় অন্তত কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। তবে এই পদক্ষেপ যেন কেবল প্রাথমিক ও অস্থায়ী না হয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই এবং স্বচ্ছ হয় সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য টার্মিনাল স্থানান্তর ও বিকেন্দ্রীকরণ একান্ত অপরিহার্য। গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদকে শহরের বাইরে কেরানীগঞ্জের বাঘাইর, সাভারের হেমায়েতপুর ও বিরুলিয়া, নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর বা ভুলতায় সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। একইসঙ্গে গুলিস্তান এলাকায় সিটি বাসের জন্য আলাদা আধুনিক টার্মিনাল নির্মাণ, ফুলবাড়িয়া থেকে বিআরটিসি বাস কমলাপুরে স্থানান্তর এবং কাঁচপুরের নির্মাণাধীন নতুন টার্মিনালের কাজ ত্বরান্বিত করা অত্যন্ত জরুরি। নতুন টার্মিনালগুলোকে আধুনিক সুবিধা যেমন ডিজিটাল টিকিটিং ব্যবস্থা, যাত্রী বিশ্রামাগার, খাবারের দোকান, পরিবেশবান্ধব ডিজাইন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ গড়ে তুলতে হবে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম স্বীকার করেছেন যে, টার্মিনালগুলোতে প্রয়োজনের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বাস রয়েছে এবং এটি যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ। ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান জানিয়েছেন, ফিটনেসবিহীন ও কাগজপত্রহীন বাসের রুট পারমিট বাতিল করে পর্যায়ক্রমে বাসের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আনা হবে। এই স্বীকারোক্তিগুলো ইতিবাচক, কিন্তু এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দৃশ্যমান বাস্তবায়ন, কঠোর মনিটরিং এবং কোনো ধরনের ছাড় না দেওয়া।
প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী এই টার্মিনালগুলো ব্যবহার করেন। সড়ক থেকে বাসে ওঠার সময় ছোটখাটো দুর্ঘটনা থেকে বড় দুর্ঘটনা ঘটছে নিয়মিত। ঈদ, পূজা বা অন্যান্য বিশেষ দিনগুলোতে পরিস্থিতি চরম ভয়াবহ হয়ে ওঠে। নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। যানজটের কারণে অফিসগামীদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে, ব্যবসায়ীরা পণ্য পরিবহনে সমস্যায় পড়ছেন। সাম্প্রতিক তথ্য অনুসারে ঢাকায় প্রতিদিন ৩ থেকে ৮ মিলিয়ন কর্মঘণ্টা যানজটের কারণে নষ্ট হয়। বছরে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বায়ু দূষণের কারণে বছরে ১৫ হাজারের বেশি অকালমৃত্যু ঘটছে বলে অনুমান করা হয়। এছাড়া মানসিক চাপ, উৎপাদনশীলতা হ্রাস, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের ক্ষতি এবং শহরের সামগ্রিক জীবনমানের অবনতি ঘটছে অবিরাম।
ঢাকার যানজট নিরসনে শুধু টার্মিনাল স্থানান্তর নয়, আরও বহুমুখী ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। রুট রেশনালাইজেশন করে অপ্রয়োজনীয় রুট বাতিল করা, বিদ্যুৎচালিত বাস ও মেট্রোরেলের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানো, কনজেশন চার্জ বা পিক আওয়ার্সে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ, উন্নত আইওটি ভিত্তিক ট্রাফিক সিগন্যাল সিস্টেম চালু, ফুটপাত ও সাইকেল লেন নির্মাণ, অবৈধ পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে আধুনিক টার্মিনাল নির্মাণ, ডিজিটাল টিকিটিং ও রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু এবং নারীদের জন্য নিরাপদ ও আলাদা পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। একইসঙ্গে শহরের বাইরে স্যাটেলাইট টাউন ও শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার মাধ্যমে জনসংখ্যার চাপ কমানো যেতে পারে।
ঢাকার বাস টার্মিনাল সংকট নগর জীবনের সামগ্রিক অব্যবস্থাপনা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের প্রতিফলন। সরকার, বাস মালিক সমিতি, শ্রমিক সংগঠন, সিটি কর্পোরেশন, ট্রাফিক পুলিশ, বিআরটিএ এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ২০২৬ সালের এই উদ্যোগ যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও নিয়মিত মনিটরিংয়ের সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে ঢাকা শহর সত্যিকার অর্থে আরও বাসযোগ্য হয়ে উঠবে। নগরবাসীর প্রত্যাশা-এই উদ্যোগ যেন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। আমাদের রাজপথ যেন আর যানজটের জাঁতাকলে পিষ্ট না হয়। শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা, আধুনিকতা ও পরিবেশবান্ধবতার সমন্বয়ে ঢাকাকে একটি আধুনিক, সচল ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তোলার এখনই সঠিক সময়। সরকারের এই উদ্যোগকে সফল করতে সকল নাগরিককেও সচেতন হতে হবে এবং ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলতে হবে। তবেই ঢাকা একটি সুন্দর, চলমান ও মানুষের বাসযোগ্য শহর হিসেবে উঠে আসবে।

