১ মে ২০২৬। বিশ্ব সভ্যতার চাকা সচল রাখার কারিগরদের দিন। ১৮৮৬ সালের শিকাগো শহরের হে মার্কেটের সেই রক্তাক্ত স্মৃতি আজ ১৪০ বছর পূর্ণ করছে। দেড় শতাব্দী আগের সেই সংগ্রাম আজও বিশ্বের আনাচে-কানাচে নতুন রূপে প্রাসঙ্গিক। ২০২৬ সালের এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর অটোমেশনের জয়জয়কারের যুগে দাঁড়িয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হচ্ছে-প্রযুক্তির এই প্রবল স্রোতে শ্রমিকের পেশি শক্তি ও মানবিক মর্যাদার স্থান কোথায়? রাজধানী ঢাকার রাজপথ আজ লাল পতাকায় ঘেরা; পল্টন, প্রেসক্লাব আর মতিঝিল এলাকা মিছিলে মুখরিত। কিন্তু উৎসবের এই আমেজের আড়ালে আমাদের কি সেই আদি প্রশ্নটি তাড়া করে ফেরে না-শ্রমিক কি তার শ্রমের সঠিক মূল্য পাচ্ছে? এ বছর মে দিবসের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে শ্রমিকের ডিজিটাল নিরাপত্তা ও শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টিকে কেন্দ্র করে, যা আজকের বাস্তবতায় অত্যন্ত সময়োপযোগী।
ইতিহাসের ধূলিমাখা পাতা ওল্টালে আমরা এক পৈশাচিক শোষণ ব্যবস্থার চিত্র পাই। যেখানে শ্রমিকের জীবন ছিল স্রেফ ১৬-১৮ ঘণ্টার হাড়ভাঙ্গা খাটুনি আর সামান্য পারিশ্রমিকের এক আবর্ত। শিকাগোর সেই রক্তক্ষয়ী আন্দোলন আমাদের আট ঘণ্টা কর্মদিবসের স্বীকৃতি দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ২০২৬ সালের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমি প্রশ্ন তুলতে চাই—শ্রমিকের কর্মঘণ্টা কি সত্যিই আট ঘণ্টায় সীমাবদ্ধ আছে? তথ্যপ্রযুক্তির প্রসারের ফলে সৃষ্ট ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বা ‘গিগ ইকোনমি’র এই যুগে অফিস আর ব্যক্তিগত জীবনের দেয়াল ভেঙে গেছে। ল্যাপটপ আর স্মার্টফোনের অদৃশ্য শিকল শ্রমিককে ২৪ ঘণ্টাই কর্মব্যস্ত রাখছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, তথ্যপ্রযুক্তির প্রসারের ফলে কলকারখানার শ্রমিক থেকে শুরু করে ডেলিভারি বয় কিংবা ফ্রিল্যান্সার—সবারই এখন হৃদয়ের গভীর থেকে আসা অভিন্ন দাবি: মেধার সঠিক মূল্যায়ন আর সময়ের সঠিক পারিশ্রমিক। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পৃথক বাণীতে শ্রমিকের ঘাম আর শ্রমের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন, যা আমাদের আশান্বিত করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পথে দৃঢ় পায়ে এগোচ্ছে। দৃশ্যমান হচ্ছে একের পর এক মেগা প্রকল্প। কিন্তু এই চাকচিক্যময় উন্নয়নের নেপথ্যে থাকা লাখ লাখ শ্রমিকের জীবনযাত্রার মান নিয়ে যখন আমরা বিতর্ক করি, তখন উন্নয়ন শব্দটিকে বড়ই ফিকে মনে হয়। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে নূন্যতম মজুরি দিয়ে সংসার চালানো আজ এক দুঃসাধ্য লড়াই। ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের মতে, মজুরি বৃদ্ধি মুদ্রাস্ফীতির তুলনায় নগণ্য। আমি বিশ্বাস করি, যে উন্নয়নের চাকায় শ্রমিকের পেটে ক্ষুধার আগুন জ্বলে, সেই উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ-র মতো বড় সংগঠনগুলো রেশনিং ব্যবস্থা বা স্বাস্থ্য বিমার কথা বললেও মাঠ পর্যায়ে এর প্রতিফলন এখনো অত্যন্ত ধীর।
নিরাপদ কর্মপরিবেশের প্রশ্নে আমরা রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর অনেক পথ হেঁটেছি। কিন্তু আজও মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পগুলোতে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা বা জরুরি বহির্গমন পথের অভাব আমাদের শঙ্কিত করে। গত এক বছরে শিল্পাঞ্চলে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, নিরাপত্তার প্রশ্নে আপস করার কোনো সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট দপ্তর জানায়, ২০২৬ সালের মধ্যে সব কারখানায় শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্য থাকলেও এখনো অনেক কারখানাকে আধুনিকায়নের জন্য আল্টিমেটাম দিতে হচ্ছে। একইভাবে পরিবহন খাতে ‘শিফট সিস্টেম’ চালুর যে উদ্যোগ বিআরটিএ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো নিয়েছে, তা সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর হতে পারে। কারণ চালকের ক্লান্তি মানেই সড়কের মৃত্যুফাঁদ।
নারী শ্রমিকের অবদান আমাদের অর্থনীতির এক বড় শক্তি। কিন্তু ২০২৬ সালের এই মে দিবসেও যখন আমরা নারী-পুরুষের মজুরি বৈষম্য নিয়ে কথা বলি, তখন তা আমাদের সামাজিক অনগ্রসরতাকেই নির্দেশ করে। নারী নেত্রীরা জানান, সমান কাজে সমান মজুরির দাবিটি এখনো অনেক জায়গায় কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। মাতৃত্বকালীন ছুটি বা ডে-কেয়ার সেন্টারের সুবিধা আজও অধিকাংশ কারখানায় বিলাসিতা মাত্র। ডিজিটাল মনিটরিং দিয়ে কেবল নিরাপত্তা নয়, তাদের মেধারও সঠিক মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে, ২০২৬ সালের আলোচিত ‘সবুজ কর্মসংস্থান’ বা গ্রিন জবসের নামে যখন পুরোনো কলকারখানা বন্ধ হয়, তখন সেই শ্রমিকের পুনর্বাসনের দায়ভার কে নেবে? প্রযুক্তি পরিবর্তনের সাথে সাথে শ্রমিকদের ‘রি-স্কিলিং’ বা নতুন করে দক্ষ করে তোলার দায়িত্বটি মালিকপক্ষকেই নিতে হবে। অটোমেশনের দোহাই দিয়ে শ্রমিক ছাঁটাই করা কোনোভাবেই মে দিবসের চেতনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে না।
প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। ২০২৬ সালের এই দিনে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার বিষয়টি আমাদের জাতীয় মর্যাদার সাথে যুক্ত। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রবাসীরা এখন সরাসরি সমস্যার কথা জানাতে পারছেন, যা আশাব্যঞ্জক। তবে কফাল পদ্ধতি বা শ্রম শোষণের অভিযোগ নিরসনে কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার করা জরুরি। অভিবাসী শ্রমিকের সুরক্ষা কেবল তাদের অধিকার নয়, এটি আমাদের জাতীয় অঙ্গীকার হওয়া উচিত। রেমিট্যান্স প্রবাহে রেকর্ড সৃষ্টি হলেও এই বিপুল অর্থের কারিগরদের বিমানবন্দর থেকে বিদেশের কর্মস্থল পর্যন্ত নানা লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়। তাদের ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হলেও বাস্তব প্রতিফলন নিশ্চিত করতে হয়রানিমুক্ত প্রবেশ ও উন্নত সেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।
ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার নিয়ে আজও আমাদের দেশে জটিলতা রয়ে গেছে। ২০২৬ সালের প্রতিবেদন বলছে, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করার প্রক্রিয়া এখনো অনেক ক্ষেত্রে জটিল এবং মালিকপক্ষের বাধার সম্মুখীন হয়। মে দিবসের আসল উদ্দেশ্য হলো শ্রমিকের সম্মিলিত দরকষাকষির ক্ষমতা বৃদ্ধি করা। একটি সমৃদ্ধ অর্থনীতির জন্য শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কের কোনো বিকল্প নেই। তবে আশার কথা হলো, ২০২৬ সাল থেকে ‘ইউনিভার্সাল পেনশন স্কিম’ এর আওতায় শ্রমিকদের নিয়ে আসার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বার্ধক্যের জীবন যেন মানবেতর না হয়, সেজন্য এই সামাজিক সুরক্ষা বলয় অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি, জরুরি সেবায় নিয়োজিত শ্রমিক যারা ছুটির দিনেও কাজ করে যাচ্ছেন, তাদের প্রতি জানাই সশ্রদ্ধ সালাম। তাদের জন্য মে দিবস মানে কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং সেবার মাধ্যমে শ্রমের মর্যাদা রক্ষা করা।
শ্রমিক আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ আজ স্পষ্টভাবে জানাচ্ছেন, ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে তাদের লড়াই কেবল আট ঘণ্টার নয়, বরং মর্যাদার সাথে বেঁচে থাকার লড়াই। প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা যেন শ্রমিকের অধিকার হরণের হাতিয়ার না হয়, সেদিকে নীতিনির্ধারকদের নজর দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট দপ্তর জানায় যে, শ্রম আইন সংস্কারের কাজ চলছে এবং এতে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে সম্ভাব্য কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকি মোকাবিলার আইনি সুরক্ষা যুক্ত করা হবে। এটি নিঃসন্দেহে একটি আধুনিক ও ইতিবাচক পদক্ষেপ।
পরিশেষে বলতে চাই, ২০২৬ সালের ১ মে আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়ন মানে কেবল বড় বড় দালান বা জিডিপি বৃদ্ধি নয়; উন্নয়ন মানে প্রতিটি শ্রমিকের হাতে ন্যায্য পাওনা তুলে দেওয়া। শ্রমিকের অধিকার রক্ষা মানেই দেশের অর্থনীতির ভিত শক্ত করা। বিংশ শতাব্দী থেকে একবিংশ শতাব্দীর এই দীর্ঘ যাত্রায় শ্রমিকের ঘাম আজও রক্ত হয়ে ঝরছে পৃথিবীর মাটির প্রতিটি স্তরে। তাদের এই ত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করাই হোক ২০২৬ সালের মে দিবসের প্রধান অঙ্গীকার। মে দিবসের চেতনা জয়যুক্ত হোক, শ্রমজীবী মানুষের জয় হোক। সন্ধ্যার আলোকসজ্জার চেয়েও উজ্জ্বল হয়ে উঠুক শ্রমিকের জীবন। চাই মেধার সঠিক মূল্যায়ন আর সময়ের সঠিক পারিশ্রমিক। অভিবাসী শ্রমিকের সুরক্ষা ও রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের মর্যাদার প্রতিষ্ঠাই হোক এই দিনের চূড়ান্ত অঙ্গীকার। মে দিবস ২০২৬ সফল হোক।

