প্রতি বছর গ্রীষ্মের শুরুতেই একই করুণ চিত্র ফিরে আসে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি বড় বাজার, ছোট শহরের হাট-বাজার এবং গ্রামীণ এলাকার দোকানপাট টকটকে হলুদ আম আর উজ্জ্বল লাল লিচুতে ভরে ওঠে, যখন প্রকৃতি এখনো সেই ফলকে পূর্ণতা ও পরিপক্কতা দেয়নি। ব্যবসায়ীদের অসীম লোভ, অসাধু সিন্ডিকেটের সুসংগঠিত কারসাজি এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে অপরিপক্ক ফল কেমিক্যালের ছোঁয়ায় রাতারাতি পাকিয়ে বাজারে ছাড়া হচ্ছে। এতে সাধারণ ক্রেতারা শুধু আর্থিকভাবে প্রতারিত হচ্ছেন না, তাদের সন্তানদের জীবনই মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। আমি দৃঢ়ভাবে মনে করি, এটি আর শুধুমাত্র বাণিজ্যিক প্রতারণা বা সাধারণ ব্যবসায়িক অনিয়ম নয়-এটি একটি সুসংগঠিত জনস্বাস্থ্য অপরাধ, যা প্রতি বছর শত শত শিশু ও সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য চিরতরে নষ্ট করে দিচ্ছে এবং দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিষাক্ত করে তুলছে।
ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডারের কথা আমরা সবাই জানি। সরকারি নির্দেশনা অনুসারে সাতক্ষীরায় গোপালভোগ, গোবিন্দভোগসহ স্থানীয় জাতের আম মে মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে সংগ্রহ শুরু হলেও রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও চুয়াডাঙ্গার মতো প্রধান উৎপাদন এলাকায় হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালি বা গোলাপখাসের মতো উন্নত জাতের পরিপক্বতার সময় এখনো আসেনি। অথচ ঢাকার কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ী, নয়াবাজার, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, গুলশান, বনানী, মিরপুরসহ প্রায় প্রতিটি মার্কেটে এসব জাতের আম ঢুকে পড়েছে। এর পেছনে রয়েছে একটি শক্তিশালী ও সুসংগঠিত সিন্ডিকেট, যারা চড়া দামের লোভে অকালে গাছ থেকে ফল তুলে ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ইথোফেন, রাইপেনিং পাউডারসহ বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক প্রয়োগ করে দ্রুত পাকিয়ে বাজারজাত করছে। এই সিন্ডিকেট শুধু ফল ব্যবসায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং পরিবহন ব্যবস্থা, আড়তদারি, খুচরা বিক্রয় এবং এমনকি কিছু স্থানীয় প্রশাসনিক স্তর পর্যন্ত তাদের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব বিস্তৃত। ফলে সরকারি ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার কাগজে-কলমে থেকে যাচ্ছে, বাস্তব ক্ষেত্রে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।
অপরিপক্ব ফল খাওয়ার স্বাস্থ্যঝুঁকি কোনো নতুন আবিষ্কার নয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বছরের পর বছর ধরে বারবার সতর্ক করে আসছেন, ক্যালসিয়াম কার্বাইড থেকে নির্গত অ্যাসিটিলিন গ্যাসে আর্সেনিক, ফসফরাস ও অন্যান্য ভারী ধাতুর মতো অত্যন্ত বিষাক্ত উপাদান থাকে। এগুলো নিয়মিত খেলে প্রাথমিক পর্যায়ে তীব্র বমি, ডায়রিয়া, পেটব্যথা, মাথাব্যথা ও শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আরও ভয়াবহ—লিভার ও কিডনির স্থায়ী ক্ষতি, হজমের সমস্যা, ত্বকের বিভিন্ন রোগ এবং সবচেয়ে আতঙ্কজনক বিষয় হলো ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাওয়া। শিশুরা এই বিষের সবচেয়ে নিরীহ ও বড় শিকার। খালি পেটে অপরিপক্ব লিচু খেলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা হঠাৎ করে অত্যধিক কমে যায়, যা হাইপোগ্লাইসিমিয়া নামে পরিচিত। এতে মস্তিষ্কের ক্ষতি হয়, খিঁচুনি দেখা দেয় এবং অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে।
২০১২ সালের সেই ভয়াবহ ঘটনা এখনো দেশবাসীর মনে গভীর দাগ কেটে রেখেছে। দিনাজপুরের লিচু বাগানের আশেপাশে বাস করা ১৪ জন শিশুর মধ্যে ১৩ জন অকালে মারা গিয়েছিল। প্রথমে শুধু লিচুর বিষক্রিয়া বলে ধরা হলেও পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক গবেষণা ও আইসিডিডিআরবি’র প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, অতিরিক্ত কীটনাশক (বিশেষ করে এন্ডোসালফান) এবং অপরিপক্ক লিচুর সমন্বয় এই মর্মান্তিক মৃত্যুর প্রধান কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং বিভিন্ন স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রতিবেদনেও প্রতি লিচু মৌসুমে অপরিপক্ক ফল খেয়ে শিশু মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ এতগুলো সতর্কবার্তা ও প্রতিবেদন সত্ত্বেও সরকারি তদারকি ব্যবস্থা এতটাই দুর্বল ও অপর্যাপ্ত যে, এই অসাধু সিন্ডিকেটকে কার্যকরভাবে থামানো যাচ্ছে না। আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, প্রতিটি শিশুর এমন মৃত্যুর জন্য শুধু ব্যবসায়ীরা নয়, সরকার, প্রশাসন এবং বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোরও নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায় রয়েছে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) প্রতি বছর চাষিদের প্রশিক্ষণের আয়োজন করে এবং মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অভিযান চালায়। সাম্প্রতিক সময়ে সাতক্ষীরায় প্রায় ৯ হাজার কেজি কেমিক্যালযুক্ত অপরিপক্ক আম জব্দ করা হয়েছে এবং চট্টগ্রামগামী ট্রাক থেকে শত শত ক্যারেট আম উদ্ধার হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব অভিযান বিচ্ছিন্ন, লোকদেখানো এবং অসম্পূর্ণ। মূল সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে থাকা বড় ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা অক্ষত থেকে যান। বাজারে আড়তদার ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক যোগসাজশের অভিযোগ বহু পুরনো এবং বারবার উঠে আসে। ফলে একটি অভিযানের পর কিছুদিন চুপচাপ থাকলেও আবার সবকিছু পুরনো ছন্দে ফিরে যায়।
একজন সাধারণ ক্রেতা হিসেবে আমরা প্রতিদিন এই প্রতারণার শিকার হচ্ছি। যাত্রাবাড়ীর রবিউল ইসলামের মতো হাজার হাজার মানুষ সুন্দর রঙ ও আকর্ষণীয় চেহারা দেখে আম কিনে বাসায় ফিরে চরম হতাশায় পড়েন। বাইরে পাকা দেখালেও ভেতরে একদম কাঁচা, স্বাদহীন এবং কখনো কখনো অস্বাভাবিক গন্ধযুক্ত। বাজারে আগাম আমের দাম ১৯০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি এবং লিচুর ছড়া ৪৫০ থেকে ৯০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এই চড়া দামের সুযোগ নিয়ে অসাধু চক্র লাভের পাহাড় গড়ছে। গৃহিণীরা বলছেন, সন্তানদের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর ফল কেনা এখন দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। শিক্ষক, চাকরিজীবী, দিনমজুর, কৃষক-সমাজের সব শ্রেণির মানুষ এই সমস্যায় সমানভাবে ভুগছেন। অথচ সরকারি প্রচারণায় বলা হয় দেশে আম ও লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে, রপ্তানির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু গুণগত মান নষ্ট করে যদি ফল বাজারজাত করা হয়, তাহলে রপ্তানি বাড়বে কীভাবে? আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি ফলের সুনাম চিরতরে নষ্ট হয়ে যাবে।
এই সমস্যার গভীরতা আরও অনেক বেশি। চাষিরা অকপটে স্বীকার করেন, বাজারের চাপ এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের লোভের কারণে তাদের অকালে ফল তুলতে হয়। আড়তদাররা কম দামে কিনে কেমিক্যাল প্রয়োগ করে বেশি লাভ করেন।
ব্যবসায়ীরা চাহিদার সুযোগ নিয়ে দ্রুত বিক্রি করতে চান। আর সাধারণ ভোক্তারা নিরুপায় হয়ে ঝুঁকি নিয়ে কিনতে বাধ্য হন। এই পুরো চক্র ভাঙতে হলে শুধুমাত্র অভিযান চালালেই চলবে না, বরং কাঠামোগত ও নীতিগত পরিবর্তন আনতে হবে। কৃষি বিভাগকে চাষিদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা, সঠিক সময়ে সংগ্রহের জন্য প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা এবং আধুনিক স্টোরেজ সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে। পরিবহন পর্যায়ে কঠোর চেকপোস্ট বসাতে হবে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে আরও শক্তিশালী, স্বাধীন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে যাতে তারা রাজনৈতিক চাপমুক্ত হয়ে নিয়মিত কাজ করতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শামসুল আমিনের মতো চিকিৎসকরা বারবার বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি একেবারে অপূরণীয়। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইনের মতো ভোক্তা অধিকারকর্মীরা বাজার তদারকি জোরদার এবং ভোক্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছেন। কিন্তু আমার মতে, সচেতনতার দায়িত্ব শুধু ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দিলে চলবে না। সরকারকেই প্রধান দায়িত্ব নিতে হবে। প্রতি বছর ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার ঘোষণা করা হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবায়নের অভাবে তা শুধু কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, কৃষি বিভাগ ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় করে কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা অত্যন্ত জরুরি। দায়ী ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে শুধু জরিমানা নয়, লাইসেন্স বাতিল, কারাদণ্ড এবং সম্পত্তি-দখলের মতো কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দিন দিন বেড়েই চলেছে। তারা প্রশ্ন তুলছেন-প্রতি বছর একই ঘটনা ঘটে, একই ধরনের অভিযান হয়, কিন্তু কোনো স্থায়ী সমাধান কেন হয় না? সাধারণ কৃষকদের মতে, ‘আমরা স্বাভাবিকভাবে ফল উৎপাদন করতে চাই। কিন্তু বাজারের চাপ, মধ্যস্বত্বভোগীদের লোভ এবং সঠিক সহায়তার অভাবে তা সম্ভব হয় না। সরকার যদি চাষি ও ভোক্তার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলে এবং সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দেয়, তাহলে এই সমস্যা অনেকাংশে কমে আসবে।’ অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের একাংশ স্বীকার করেন, বাজারের চাহিদা থাকায় আগাম সরবরাহ করতে হয়, কিন্তু কেমিক্যাল ব্যবহার সম্পূর্ণ অনৈতিক ও অগ্রহণযোগ্য।
এই পরিস্থিতিতে ভোক্তাদের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফল কেনার সময় অতিরিক্ত চকচকে, অস্বাভাবিক উজ্জ্বল বা গন্ধহীন ফল এড়িয়ে চলতে হবে। ফল কিনে অন্তত ৩০-৪০ মিনিট পানিতে ভিজিয়ে রেখে ভালোভাবে ধুয়ে খাওয়া উচিত। সন্দেহজনক কোনো বিক্রেতা বা ফল দেখলে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের হটলাইন বা অ্যাপে অভিযোগ করা উচিত। কিন্তু এটি একা যথেষ্ট নয়। আমাদের সমগ্র সমাজকে সচেতন হতে হবে যে, স্বাস্থ্যের সঙ্গে কোনো আপস করা যাবে না। গ্রীষ্মের এই সুস্বাদু ফলগুলো প্রকৃতির অমূল্য উপহার। সঠিক সময়ে পরিপক্ক ফল খেলে শরীর পায় প্রাকৃতিক ভিটামিন এ, সি, খনিজ লবণ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং প্রচুর পুষ্টি। কৃত্রিমভাবে পাকানো ফল শুধু সেই উপকারিতা নষ্ট করে না, বরং শরীরে বিষ ঢুকিয়ে দেয়।
সরকারের উচিত এখনই জাতীয় পর্যায়ে একটি শক্তিশালী ও স্থায়ী টাস্কফোর্স গঠন করা- যাতে কৃষি, স্বাস্থ্য, খাদ্য এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে কাজ করে। চাষিদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সচেতনতামূলক ব্যাপক ক্যাম্পেইন, আধুনিক স্টোরেজ সুবিধা বৃদ্ধি এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের উন্নয়ন জরুরি। একইসঙ্গে ভোক্তা অধিকার আইনকে আরও কঠোর ও কার্যকর করতে হবে। যদি এখনই সাহসী ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয়, তাহলে প্রতি বছর শিশু মৃত্যু, লিভার-কিডনি রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়েই চলবে এবং জনস্বাস্থ্য খাতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে।
আমাদের দেশ কৃষিপ্রধান। আম ও লিচু আমাদের জাতীয় গর্ব এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অন্যতম উৎস। কিন্তু কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর লোভের কারণে এই গর্বকে বিষাক্ত করে তোলা কোনোভাবেই চলতে পারে না। এই অপরাধমূলক চক্রকে ভাঙতে হবে। সরকার, প্রশাসন, সাধারণ মানুষ এবং সচেতন নাগরিক সমাজের সম্মিলিত চাপে অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় আগামী প্রজন্মকে সুস্থ ও পুষ্টিকর ফলের পরিবর্তে বিষ খাইয়ে আমরা নিজেরাই তাদের স্বাস্থ্য ধ্বংস করব। সময় এসেছে কঠোর, সাহসী ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ নেওয়ার। জনস্বাস্থ্য রক্ষা করা সরকারের প্রধান দায়িত্ব, কিন্তু সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আসুন, নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও পরিপক্ক ফলের দাবিতে সকলে সোচ্চার হই এবং একটি সুস্থ প্রজন্ম গড়ে তুলি।

