টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলার নদ-নদী, খাল-বিল ও মুক্ত জলাশয় থেকে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় প্রজাতির মাছ। স্থানীয় বাসিন্দা, জেলে, ব্যবসায়ী ও মৎস্য সংশ্লিষ্টদের মতে, কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে অদূর ভবিষ্যতে এ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী দেশীয় মাছ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। এর ফলে নদীতীরবর্তী জনপদের মানুষ ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছে শৈশবের পরিচিত দেশীয় মাছের স্বাদ ও জলজ জীববৈচিত্র্যের ঐতিহ্য।
স্থানীয় সূত্র ও প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাত্র এক দশক আগেও ধনবাড়ী উপজেলার ঝিনাই নদী, বংশাই নদী, বিভিন্ন খাল-বিল, পুকুর-ডোবা ও মুক্ত জলাশয়ে প্রচুর পরিমাণে দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। সে সময় বহু মানুষ মাছ ধরাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে স্বচ্ছন্দে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু বর্তমানে মুক্ত জলাশয়ে মাছের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় অনেক জেলে বাধ্য হয়ে বিকল্প পেশায় যুক্ত হয়েছেন।
মৎস্য বিভাগের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের মিঠাপানির প্রায় ২৬০ প্রজাতির মাছের মধ্যে শতাধিক প্রজাতি বর্তমানে অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে। এর মধ্যে টেংরা, পুঁটি, বাইম, বোয়াল, গজার, আইড়, ভেটকি, ভোলা, মাগুর, শৈল, চেলা, টাকি, চাঁদা, বাইশ, কাকিলা, খলিসা ও গুলশা উল্লেখযোগ্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব মাছের অধিকাংশই একসময় ধনবাড়ীর জলাশয়ে প্রচুর পাওয়া গেলেও এখন অনেকটাই বিরল হয়ে পড়েছে।
মৎস্য কর্মকর্তারা দেশীয় মাছের সংকটের পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে নদী-নালা ও খাল-বিল দখল এবং ভরাট, চায়না দুয়ারী জালের অবাধ ব্যবহার, মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস, বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া, সেচের মাধ্যমে জলাশয় শুকিয়ে মাছ আহরণ, ডিমওয়ালা ও পোনা মাছ নিধন এবং কৃষিজমিতে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার। স্থানীয়দের দাবি, ধনবাড়ী উপজেলার বিলগুলো ইজারা দেওয়ার ফলে অবাধে মাছ আহরণ বাড়ায় দেশীয় মাছের সংখ্যা আরও দ্রুত কমে যাচ্ছে।
যদুনাথপুর ইউনিয়নের ৯৮ বছর বয়সী হোসেন আকন্দ স্মৃতিচারণ করে বলেন, “ছোটবেলায় দেখতাম, বিলে বিলে মাছে ভরে থাকত। জাল ফেললেই মাছ উঠত। বর্ষার সময় তো পানির সঙ্গে ঘরেও মাছ চলে আসত। এখন খাল-বিলে মাছের দেখাই মেলে না। মনে হয় পানিটাই যেন মরে গেছে।”
বানিয়াজান ইউনিয়নের জেলে ইউসুপ মিয়া জানান, “বহু বছর মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করে সংসার চালিয়েছি। কিন্তু কয়েক বছর ধরে আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। দেশীয় মাছ এখন খুবই দুর্লভ। বাজারে যা আসে, তার দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এক কেজি ছোট টেংরা মাছের দাম এখন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা।”
আমলা বাজারের মাছ ব্যবসায়ীরাও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, একসময় বাজারে দেশীয় ছোট মাছের কোনো সংকট ছিল না। স্বল্প আয়ের মানুষও সহজেই এসব মাছ কিনতে পারতেন। বর্তমানে সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম বেড়েছে কয়েক গুণ।
ধনবাড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমাদের ছেলেবেলায় বিভিন্ন ধরনের জাল দিয়ে মাছ ধরা হতো। এত মাছ পাওয়া যেত যে মানুষ খেতে খেতেই বিরক্ত হয়ে যেত। এখন সেই দেশীয় ছোট মাছ খুঁজে পাওয়াই কঠিন। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো শুধু বইয়ের ছবিতেই পুঁটি, টেংরা বা মাগুর মাছ দেখবে।”
ধনবাড়ী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সৌরভ কুমার দে বলেন, জলাশয় ভরাট, নদ-নদীতে পানির সংকট, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অতিরিক্ত মৎস্য আহরণ, সেচের মাধ্যমে মাছ ধরা এবং কীটনাশকের ব্যবহার দেশীয় মাছের সংখ্যা দ্রুত কমিয়ে দিচ্ছে। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে অনেক দেশীয় মাছ চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।
তিনি জানান, এখনই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিলে কিছু প্রজাতির মাছ পুনরুদ্ধার সম্ভব। এজন্য চায়না দুয়ারী জালের ব্যবহার বন্ধ, প্রজনন মৌসুমে মাছ আহরণ নিয়ন্ত্রণ, জলাশয় সংরক্ষণ ও পুনঃখনন এবং নদী-খালের স্বাভাবিক সংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
মৎস্য কর্মকর্তা আরও বলেন, স্থানীয় প্রশাসন, মৎস্য অধিদপ্তর ও জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। জলাশয়ে নিয়মিত পোনা অবমুক্তকরণ, মৎস্য অভয়াশ্রম স্থাপন এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অবৈধ জালের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করা গেলে দেশীয় মাছ সংরক্ষণে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে।
একসময় দেশীয় মাছের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত ছিল ধনবাড়ীর নদ-নদী ও খাল-বিল। পরিবেশবিদ ও স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, জীববৈচিত্র্য ও ঐতিহ্য রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই।

