বাংলাদেশের জাতীয় ফুল শাপলা একসময় দেশের গ্রামাঞ্চলের বিল-ঝিল, পুকুর, খাল ও জলাশয়জুড়ে নয়নাভিরাম সৌন্দর্য ছড়িয়ে থাকত। ধনবাড়ী উপজেলাতেও লাল, সাদা, গোলাপি, বেগুনি ও নীল রঙের শাপলার সমারোহ ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে কালের বিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তন, জলাশয় ভরাট, দখল এবং আধুনিক কৃষিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক ও কীটনাশকের ব্যবহারের কারণে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এই জাতীয় ফুল।
বাংলাদেশের আবহাওয়ায় সাধারণত সাদা, লাল, বেগুনি, হলুদ ও নীল—এই পাঁচ ধরনের শাপলা দেখা যায়। এর মধ্যে সাদা শাপলা দেশের জাতীয় ফুল হিসেবে স্বীকৃত। একসময় বর্ষা ও শরৎ মৌসুমে ধনবাড়ীর বিভিন্ন জলাশয় শাপলার সৌন্দর্যে ভরে উঠলেও বর্তমানে সেই দৃশ্য প্রায় বিলীন। এখন কোথাও কোথাও গভীর জলাশয়ে কিছু সাদা শাপলা দেখা গেলেও লাল, নীল, গোলাপি ও বেগুনি শাপলা প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
শাপলা শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতীকই নয়, গ্রামীণ জনজীবনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। শাপলার লতা দিয়ে সবজি রান্না করা হতো এবং এর ফল, যা স্থানীয়ভাবে ‘ড্যাভ’ নামে পরিচিত, সিদ্ধ বা ভেজে খাওয়া হতো। এছাড়া অনেক কৃষক শাপলা সংগ্রহ করে স্থানীয় হাটে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, আগে অল্প পানিযুক্ত জলাশয়েও প্রচুর শাপলা ফুটত। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ জলাশয় ভরাট হয়ে গেছে এবং কৃষিজমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে শাপলার স্বাভাবিক বংশবিস্তার ব্যাহত হচ্ছে।
ধনবাড়ীর ইতিহাস গবেষক মোকাদেম বাবু বলেন, এক দশক আগেও উপজেলার প্রায় প্রতিটি মাঠ ও জলাশয়ে বিভিন্ন রঙের শাপলার সমারোহ ছিল। বর্তমানে কেবল কিছু সাদা শাপলা দেখা গেলেও লাল, নীল, গোলাপি ও বেগুনি শাপলা প্রায় বিলুপ্ত। তিনি বলেন, জলাশয় ভরাট, রাসায়নিকের অপব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনই এর প্রধান কারণ। ফলে গ্রামবাংলার বর্ষার সেই চিরচেনা শাপলার সৌন্দর্য এখন স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে।
ধনবাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মাসুদুর রহমান বলেন, আধুনিক কৃষি চর্চা, জলাশয় দখল ও দূষণের কারণে জাতীয় ফুল শাপলার অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। শাপলা সংরক্ষণে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো গবেষণা বা কার্যক্রম না থাকলেও বীজ সংরক্ষণ করে কৃষকদের মাঝে বিতরণ এবং গবেষণাভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে জাতীয় ফুলটির অস্তিত্ব রক্ষা করা সম্ভব।

