তীব্র গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার মধ্যে ময়মনসিংহ বিভাগজুড়ে ভয়াবহ লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। দিনে-রাতে দফায় দফায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর ও নেত্রকোনার জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন এলাকায় ১০ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোথাও বিদ্যুৎ এলেও তা দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী হচ্ছে না।
লোডশেডিংয়ের কারণে তীব্র গরমে মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসাসেবা এবং নিত্যদিনের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় শিশু, বয়স্ক ও রোগীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুতের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেলেও জাতীয় গ্রিড থেকে প্রয়োজনীয় সরবরাহ মিলছে না। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের বড় ব্যবধান সামাল দিতে বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ময়মনসিংহ গ্রিডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদুর হক জানান, সন্ধ্যার সময় ময়মনসিংহ জোনে বিদ্যুতের চাহিদা ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। কিন্তু সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১ হাজার ৯১ থেকে ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট। ফলে প্রতিদিনই বিদ্যুতের ঘাটতি মোকাবিলায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহ জোনে দৈনিক গড়ে ৫০ থেকে ৫৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে। অন্যদিকে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিভিন্ন এলাকায় চাহিদার তুলনায় মাত্র অর্ধেকের মতো বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে কোথাও ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার কোনাবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। এতে সন্তানদের পড়াশোনা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি তীব্র গরমে রাতে ঘুমানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
নেত্রকোনায় পরিস্থিতি আরও নাজুক। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১০টি উপজেলায় ১৫৯ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৬৬ মেগাওয়াট। ফলে অনেক এলাকায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যুৎ এলেও অনেক সময় ভোল্টেজ এত কম থাকে যে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি সচল রাখা যায় না।
জামালপুরের বিভিন্ন উপজেলাতেও ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। পিডিবি জামালপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মহিবুল আজাদ রুবেল জানান, জেলার চাহিদা ৩২ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ রয়েছে মাত্র ২৪ মেগাওয়াট। ফলে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
শেরপুরের পাঁচটি উপজেলাতেও কয়েক সপ্তাহ ধরে দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাট অব্যাহত রয়েছে। এতে আবাসিক গ্রাহকদের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান, ডিপ ফ্রিজনির্ভর ব্যবসা ও ইলেকট্রনিকস দোকানগুলোও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাতীয় গ্রিডে উৎপাদন সংকট এবং চাহিদা বৃদ্ধির কারণেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সরবরাহ স্বাভাবিক হলে লোডশেডিং কমে আসবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেছেন।
এদিকে সাধারণ মানুষের দাবি, শুধু আশ্বাস নয়, বিদ্যুৎ সংকটের স্থায়ী সমাধানে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি লোডশেডিংয়ের নির্দিষ্ট সময়সূচি প্রকাশ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও আবাসিক এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

