শহরের ব্যস্ততা, কোলাহল আর ইট-পাথরের ভিড়ের মাঝেও সবুজের স্বপ্ন দেখেন একজন শিক্ষক। হাতে চক-ডাস্টার থাকলেও অবসরে তার সঙ্গী হয় গাছের চারা, বীজ আর কোদাল। কখনো রাস্তার পাশে, কখনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আঙিনায়, আবার কখনো পুকুরপাড়ে নিরবে গাছ লাগিয়ে চলেছেন তিনি। প্রকৃতি ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই তার এই উদ্যোগ।
তিনি ফরিদপুরের সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের সিনিয়র শিক্ষক মো. নুরুল ইসলাম। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকালে ফরিদপুর শহরের জিলা স্কুলের সামনের পুকুর, চৌরঙ্গী পুকুরের পাড়সহ কয়েকটি স্থানে প্রায় ৬০০টি তালবীজ বপন করেছেন তিনি। উদ্দেশ্য পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, সবুজায়ন বাড়ানো এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর পরিবেশ তৈরি করা।
শিক্ষকতা নুরুল ইসলামের পেশা হলেও বৃক্ষরোপণ যেন তার নেশায় পরিণত হয়েছে। নিজের উদ্যোগে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা রোপণ ও বীজ বপন করে ইতোমধ্যে এলাকায় তিনি বৃক্ষপ্রেমী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।
নুরুল ইসলামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফরিদপুরের সরকারি সড়কের ধারে ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ পর্যন্ত প্রায় ৬০ হাজার গাছ লাগিয়েছেন তিনি। কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, শিমুল, খেজুর, তাল, নারিকেল, শিউলি ও পলাশসহ নানা প্রজাতির গাছ তার হাতে রোপিত হয়েছে। এসব গাছ বড় হয়ে এখন অনেক জায়গায় ছায়া, সৌন্দর্য ও পরিবেশের বৈচিত্র্য বাড়াচ্ছে।
বিশেষ করে তালগাছ নিয়ে তার আগ্রহের পেছনে রয়েছে পরিবেশ ও বজ্রপাতের বিষয়টি। বাংলাদেশে বর্ষাকালে বজ্রপাত একটি পরিচিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে তাল, নারিকেলসহ উঁচু গাছের ভূমিকা নিয়ে গ্রামবাংলায় দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধারণা রয়েছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট গাছ একাই বজ্রপাত ঠেকাতে পারে—এমন নিশ্চয়তা বৈজ্ঞানিকভাবে দেওয়া যায় না। বরং বজ্রপাতের সময় নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা এবং সতর্কতা অবলম্বনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তবুও নুরুল ইসলামের কাছে তালবীজ বপন শুধু বজ্রপাতের বিষয় নয় এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা। তার বিশ্বাস, আজ একটি বীজ মাটিতে পুঁতে দিলে কয়েক বছর পর সেটিই হয়ে উঠতে পারে একটি বড় গাছ, যার ছায়া ও পরিবেশগত উপকার ভোগ করবে মানুষ।
ফরিদপুর শহরের কমলাপুরের বাসিন্দা নুরুল ইসলাম। তার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রহমান ফকির স্বাস্থ্য সহকারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মা নুর বেগম ছিলেন গৃহিণী। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। স্ত্রী শামীমা নাসরিন গৃহিণী। তাদের দুই সন্তান—গোধূলী ইসলাম ফরিদপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং নুরুল আহসান সকাল ফরিদপুর জিলা স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
শিক্ষক নুরুল ইসলাম বলেন, বজ্রপাত ঠেকাতে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই তালবীজ বপন করেছি। আজ যে বীজগুলো বপন করছি, হয়তো একদিন এগুলো বড় গাছ হবে। তখন মানুষ এর সুফল পাবে।
তার এই উদ্যোগ হয়তো একদিনে শহরের চেহারা বদলে দেবে না। কিন্তু ৬০০টি বীজের প্রতিটি থেকে যদি একটি করে গাছও বেড়ে ওঠে, তাহলে সেই সবুজের গল্পটি ছড়িয়ে পড়বে বহু দূর। আর একজন শিক্ষক হিসেবে নুরুল ইসলামের সবচেয়ে বড় পাঠ হয়তো এটাই প্রকৃতিকে ভালোবাসার কথা শুধু বইয়ে পড়ানো নয়, নিজের হাতে মাটিতে বীজ পুঁতে তার উদাহরণ তৈরি করাও সম্ভব।

