জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ ছয় নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। দণ্ডপ্রাপ্ত অন্যরা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন।
একই মামলায় ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ ও মাইনুল হোসেন খান নিখিলের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির ৫০ শতাংশ বাজেয়াপ্ত করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের পরিবারের মধ্যে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
মঙ্গলবার বেলা ১২টার দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায় ঘোষণা করেন। এর আগে সোমবার রায় ঘোষণার জন্য এ দিন ধার্য করেছিলেন আদালত।
উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে গত ১৭ আগস্ট মামলাটির রায় অপেক্ষমাণ রাখেন ট্রাইব্যুনাল। শুনানিতে প্রসিকিউশন আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের আবেদন করলেও আসামিপক্ষ তাদের খালাস দাবি করে।
প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম যুক্তিতর্কে বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘিরে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বৈঠকে আন্দোলনকারীদের হত্যার ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা করা হয়েছিল। মামলায় দাখিল করা বিভিন্ন অডিও-ভিডিওতে এর প্রমাণ রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তার অভিযোগ, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দিয়েছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৫ আগস্ট পর্যন্ত নির্বিচারে গুলি চালিয়ে বহু মানুষকে হত্যা করা হয়।
ওবায়দুল কাদের, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ও মোহাম্মদ আলী আরাফাতের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী এম হাসান ইমাম বলেন, প্রসিকিউশন মূলত এই তিন নেতার বিরুদ্ধে কমান্ড রেসপনসিবিলিটির অভিযোগ এনেছে এবং তারা হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে দাবি করেছে। তার যুক্তি, জনগণের জানমাল রক্ষায় ‘শুট অ্যাট সাইট’ নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে এই তিন নেতা কোনো কমান্ডিং পজিশনে ছিলেন না এবং তারা কাউকে হত্যা করেননি বা হত্যার নির্দেশও দেননি বলে দাবি করেন তিনি।
ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী ইসরাত জাহান বলেন, গণঅভ্যুত্থান দমনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে সাদ্দাম, ইনান, পরশ ও নিখিলের নাম আসেনি। অন্যরা নেতৃত্ব দিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। পাশাপাশি অধীনস্ত নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ব্যর্থ হয়েছেন বলেও যুক্তি দেন তিনি। অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি দাবি করে আসামিদের খালাসের আবেদন করেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা।
পরে প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজ’-এর ব্যাখ্যা তুলে ধরে আসামিদের অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়টি আদালতে উপস্থাপন করেন। আন্দোলন দমনের সময় একজন ব্যক্তি মারা গেলেও সংশ্লিষ্টরা অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত হতে পারেন—এমন আইনি যুক্তিও তুলে ধরেন তিনি।
এর আগে গত ১২ আগস্ট প্রসিকিউশনের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, সাত আসামির বিরুদ্ধে আনা চারটি অভিযোগই প্রসিকিউশন প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে এবং জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে মানুষ হত্যা ও আহত করার ঘটনায় তাদের দায় রয়েছে। এ কারণে কোনো অনুকম্পা না দেখিয়ে সর্বোচ্চ সাজা দেওয়ার আবেদন করেন তিনি।
যুক্তিতর্কে ওবায়দুল কাদেরের ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন চিফ প্রসিকিউটর। তার দাবি, বিভিন্ন সময়ে ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য ছিল দায়িত্বজ্ঞানহীন ও উসকানিমূলক। এসব বক্তব্যের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগসহ দলটির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সক্রিয় করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মামলার অন্য আসামিদের বিষয়ে আমিনুল ইসলাম বলেন, তারা রাজনৈতিক নেতৃত্বের আড়ালে থাকা দুর্বৃত্ত, দুর্নীতিবাজ ও দুষ্কৃতকারী। প্রসিকিউশনের দাবি, সাত আসামির প্রত্যেকের ব্যক্তিগত দায়ের পাশাপাশি সুপিরিয়র কমান্ড বা ঊর্ধ্বতন কমান্ডের দায়ও রয়েছে। এসব কারণেই তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করা হয়।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ওবায়দুল কাদের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলিতে পরিকল্পনা, নির্দেশনা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাতসহ অন্য নেতারাও ওই প্রক্রিয়ায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন বলে দাবি করে প্রসিকিউশন।
মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়, পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলন দমনে সহায়ক বাহিনী হিসেবে সরাসরি হামলায় অংশ নেন। তাদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও অঙ্গহানির অভিযোগও আনা হয়।
এই মামলায় ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে আসামি করা হয় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানকে।
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়ে ট্রাইব্যুনাল সাত আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের গ্রেপ্তার করতে না পারায় আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রীয় খরচে আইনজীবী নিয়োগ করা হয়। আইনের বিধান অনুযায়ী, আসামিদের অনুপস্থিতিতেও বিচার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। গত ২২ জানুয়ারি আদালত সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। এরপর ৪ আগস্ট মামলায় প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক শুরু হয় এবং পরে আসামিপক্ষ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে।

