রাজবাড়ীর আরোগ্য ক্লিনিকে সিজারিয়ান অপারেশনের পর সোমা আক্তার (২৫) নামে এক প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। আগামী দুই কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ ও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের মধ্যে ঘটনাটি তদন্তে নিরপেক্ষ অনুসন্ধান শুরু হচ্ছে।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাতে বিষয়টি নিশ্চিত করেন রাজবাড়ীর সিভিল সার্জন ডা. এস এম মাসুদ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. মো. জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্যরা হলেন ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের গাইনি অ্যান্ড অবস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শাহানা পারভীন এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল-১ শাখার সহকারী পরিচালক ডা. মো. মাহমুদুর রহমান। রাজবাড়ীর সিভিল সার্জন ডা. এস এম মাসুদকে কমিটির সদস্যসচিব করা হয়েছে।
সিভিল সার্জন জানান, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রীর দৃষ্টিগোচর হয়েছে বিষয়টি। রোববার সকালে মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিনিধিদল রাজবাড়ীতে এসে সরেজমিন তদন্ত শুরু করবে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গঠিত তিন সদস্যের কমিটি আগামী দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবে।
এর আগে গত ২৫ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টার দিকে রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন নিহত সোমার স্বজনদের সঙ্গে দেখা করেন। এ সময় তিনি দুই দিন বয়সী নবজাতক শিশুটিকে কোলে তুলে নেন এবং তার জন্য নতুন জামাকাপড়, উপহার ও প্রয়োজনীয় ডায়াপার পরিবারের কাছে পৌঁছে দেন। পরিদর্শনকালে রাজবাড়ীর সিভিল সার্জন ডা. এস এম মাসুদ ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফয়জুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন বলেন, বিষয়টি নজরে আসার পর তাৎক্ষণিকভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। চিকিৎসাগত কোনো অবহেলা ছিল কি না, তা নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধানে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দায়ী ক্লিনিক বা চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাজবাড়ী সদর উপজেলার পাচুরিয়া ইউনিয়নের কোনাইল গ্রামের রবিউল ইসলামের স্ত্রী সোমা আক্তার গত ২২ সেপ্টেম্বর সন্তান প্রসবের জন্য রাজবাড়ী শহরের বড়পুল এলাকার আরোগ্য ক্লিনিকে ভর্তি হন। সেখানে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. শেখ মো. আব্দুল হান্নান তার সিজারিয়ান অপারেশন করেন। অ্যানেসথেসিয়া দেন ডা. জিয়াউল আহসান।
অপারেশনের পরপরই সোমার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, চিকিৎসকের অবহেলার কারণেই সোমার মৃত্যু হয়েছে। নিহতের বড় বোন রাজিয়া বেগম বলেন, অপারেশনের আগে চিকিৎসক তাদের সোমার কোনো শারীরিক জটিলতার কথা জানাননি। অস্ত্রোপচারের পর অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে ফরিদপুরে পাঠানো হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানান। এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের শাস্তি দাবি করেছেন তারা।
অন্যদিকে, আরোগ্য ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের দাবি, সোমার হৃদ্যন্ত্রের ভালভে আগে থেকেই জটিলতা ছিল। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ফরিদপুরে পাঠানো হলে সেখানেই তার মৃত্যু হয়।
অপারেশনকারী চিকিৎসক ডা. এস এম এ হান্নান বলেন, সোমার সিজারিয়ান অপারেশন ভালোভাবেই সম্পন্ন হয়েছিল। তবে শেষের দিকে তার শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় আইসিইউ সাপোর্টের প্রয়োজন হয়। এ কারণে তাকে ফরিদপুরে রেফার করা হয়েছিল।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগের বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

