বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের সাত বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার চূড়ান্ত বিচার শেষ হয়নি। বিচারিক আদালত ও হাইকোর্টে বিচার প্রক্রিয়া শেষ হলেও সর্বোচ্চ আদালতে মূল আপিলের শুনানি এখনও শুরু হয়নি। ফলে কবে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে এবং রায় কার্যকর হবে, তা অনিশ্চিত।
২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর বুয়েটের শেরেবাংলা হলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নির্যাতনে নিহত হন আবরার ফাহাদ। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে তৎকালীন কয়েকটি চুক্তির সমালোচনা করে ফেসবুকে দেওয়া একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে তাকে হত্যা করা হয় বলে মামলার অভিযোগপত্র ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে আসে। পরে রাত ৩টার দিকে শেরেবাংলা হলের সিঁড়ি থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
ছেলের হত্যার সাত বছর পরও রায় কার্যকর না হওয়া এবং মামলার কয়েকজন আসামি পলাতক থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ বুলু ও মা রোকেয়া খাতুন। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) কুষ্টিয়া শহরের পিটিআই সড়কের পাশে আবরারের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, আগের মতোই ঘরে রয়েছে তাঁর বিছানা, পড়ার টেবিল, মোবাইল, ল্যাপটপসহ ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী। এসব স্মৃতি আঁকড়ে দিন কাটছে পরিবারের সদস্যদের।
আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ বুলু দ্রুত রায় কার্যকরের পাশাপাশি বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। ফোনে তিনি বলেন, ‘ভারত আমাদের দেশটাকে গ্রাস করতে চেয়েছিল। আবরার সেটার প্রতিবাদ করেছিল। যে কারণে আবরারকে জীবন দিতে হয়েছে, সেটার বাস্তবায়ন চাই আমরা। দেশকে নিয়ে আবরার ফাহাদের যেই স্বপ্ন ছিল, সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ দেখতে চাই।’
এদিকে নাতির হত্যার বিচারের রায় কার্যকর হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন আবরারের ১০৫ বছর বয়সী দাদা আব্দুল গফুর। জীবদ্দশায় নাতি হত্যার বিচারের রায় কার্যকর দেখে যেতে চান তিনি।
মামলার নথি অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের এক মাসের মাথায় ২০১৯ সালের ১৩ নভেম্বর ২৫ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। ২০২০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ রায় দেন। এতে ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে মামলাটি হাইকোর্টে আসে। ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের শুনানি শেষে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ বিচারিক আদালতের রায় বহাল রাখেন। ফলে ২০ আসামির মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল থাকে।
হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে দণ্ডিত আসামিরা আপিল ও লিভ টু আপিল করেছেন। রাষ্ট্রপক্ষ নতুন করে আপিল করেনি। বর্তমানে মামলাটি আপিল বিভাগে বিচারাধীন। তবে সেখানে মূল আপিলের শুনানি এখনও শুরু হয়নি। আসামিপক্ষের আইনজীবীদের তথ্য অনুযায়ী, মামলার প্রায় ১০ হাজার পৃষ্ঠার পেপারবুক প্রস্তুত হয়েছে। কিন্তু মামলাটি এখনও আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় ওঠেনি।
এদিকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২০ আসামির মধ্যে বিচারিক আদালতের রায়ের সময় থেকেই তিনজন পলাতক—মোর্শেদ-উজ-জামান, এহতেশামুল রাব্বি ও মুজতবা রাফিদ। আরেক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মুনতাসির আল জেমি ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট গাজীপুরের হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে পালিয়ে যান। সব মিলিয়ে মামলায় দণ্ডিত ২৫ আসামির মধ্যে চারজন বর্তমানে পলাতক।

